বিগত ১৭ বছরের শাসনে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার্য সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি ছিল জনগণের আন্দোলন এবং জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আন্দোলনে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সর্বপ্রথম রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফায় রূপ নেয়। তিনি দাবি করেন, সর্বশেষ নির্বাচনে জনগণ এই কর্মসূচির পক্ষে রায় দিয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা দেখতে হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, অতীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং জ্বালানি খাতকে দুর্নীতির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্তমান গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সরবরাহ শুরু হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন অবহেলিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে নতুন রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো যায়।
শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক জোনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জায়গায় কোরীয় বিনিয়োগে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিটিএমসি ও বিএসইসির অধীন বন্ধ থাকা প্রায় ৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫১ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।
তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মেডিকেল কলেজ থাকা জেলা হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং অন্যান্য জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন করা হবে। পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
এছাড়া হার্টের স্টেন্ট, চোখের লেন্স ও ডায়ালাইসিস–সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কর কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে জানান তিনি।
তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাখো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রযুক্তিপণ্যের ওপর কর শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
বক্তব্যের শেষদিকে তারেক রহমান বলেন, সরকার শুধু প্রতিশ্রুতি দিতে নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়। তিনি বলেন, জনগণের জন্য কী করা গেছে, সেটিই সরকারের সাফল্যের মূল পরিমাপ হবে। একই সঙ্গে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।