মো. বদরুল আলম, সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। একসময় কৃষকের প্রধান পেশা ছিল ধান চাষ। বছরের পর বছর জমিতে ধান ফলিয়ে সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পাশাপাশি বছর শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতেন কৃষকরা। সঞ্চয়কৃত টাকা দিয়ে নতুন জমি ক্রয় অথবা অন্যের জমি লিজ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক পুরনো কৃষক এবং কৃষক পরিবার।
উপজেলার ছিলিমপুর, বেতুয়া, বড়চওনা, কচুয়া, নিশ্চিন্তাপুর, আড়াই পাড়া, কীত্তনখোলা, পাথারপুর’সহ অন্যান্য এলাকা ঘুরে একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, হালচাষ, ধান কাটা-মাড়াই ও কৃষিশ্রমিকের মজুরি সবকিছুতেই বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি ধানের দাম। ফলে কয়েক মাস পরিশ্রম করে ধান উৎপাদনের পর বাজারে বিক্রি করেও অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচ ওঠে না। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। ধান পাকার পর সময়মতো শ্রমিক না পেলে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় কৃষক শাহজাহান মিয়া বলেন, আগে ধান চাষ করে সিজন শেষে কিছু লাভ (টাকা) থাকত। কিন্তু এখন সার,বিষ কিনতে বেশি টাকা লাগে, কামলার (শ্রমিক) দাম বেশি, সেচ ও অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। সব খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে কিছুই থাকে না। ধান চাষের জন্য অনেক সময় ধার/ ঋণ নিতে হয়। আশা থাকে ধান বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করব। কিন্তু ধানের দাম কম থাকায় কখনোই পুরো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। বছর শেষে লাভের বদলে ঋণের বোঝা টানতে হয় বেশিরভাগ কৃষককে।
স্থানীয় আড়াই পাড়া এলাকার কৃষক আ. মান্নান বলেন, বাজারে ধানের দাম কম থাকলেও চালের দাম তুলনামূলক বেশি। কৃষক তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। ক্ষেতে ধান চাষ কমাই দিয়েছি। নিজের খাবারের যতটুকু লাগে ততটুকুই রোপণ করি। বাকি ক্ষেত পতিত আর ২টা বর্গা দিয়েছি। ধানের দাম কম থাকায় ছেলে ধান চাষ করতে চায় না। আবার ক্ষেত পতিত রাখতেও ভালো লাগে না।
তিনি আরো বলেন, রোপনের সময় থেকে খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে ভালো হতো। পাশাপাশি সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম কমানো এবং কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ব্যবস্থা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
উপজেলার কচুয়া এবং বড়চওনা ধানের বাজারে গিয়ে দেখা যায় নাজিরসাইল ধান মণ প্রতি ১৩৩০ থেকে ১৩৪০ টাকা, আটাইশ এবং উনেত্রিশ ধান মণ প্রতি ১১৪০-১১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
কৃষক বিল্লাল হোসেন ধান নিয়ে এসেছেন অপেক্ষা করছেন কিছুক্ষণ যদি ধানের বাজারের দাম বাড়ে। কিন্তু দাম না বাড়ায়, তিনি সর্বশেষ চলমান দামেই বিক্রি করে চলে গেলেন।
কৃষক আ. মান্নানের ছেলে আসাদুল ইসলাম বলেন, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষক ধান চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। এতে কৃষকের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি দেশের খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, কৃষকের ঘাম ও পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। ধান বিক্রি করে যেন কৃষক লোকসানের মুখে না পড়ে, বছর শেষে ঋণের বোঝা না, কিছুটা লাভ নিয়ে যেন ঘরে ফিরতে পারেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন জানান, ধানের দাম কম হওয়ার কারণে উপজেলায় কৃষিজমি পতিত নেই। উপজেলার অধিকাংশ জমিতেই মৌসুমভেদে কোনো না কোনো ফসলের আবাদ হচ্ছে। কেউ ধানের পরিবর্তে গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে হয়তো কোনো কোনো কৃষক নির্দিষ্ট মৌসুমে জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন না। সেচের সমস্যাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত কারণে এক-দুজনের জমি সাময়িকভাবে অনাবাদি থাকতে পারে।
ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে কৃষি বিভাগের কোনো উদ্বেগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো কৃষক ধান চাষ করে ন্যায্যমূল্য না পেলে তিনি বিকল্প অন্য কোনো ফসল চাষ করতে পারেন।