মতামত, অনুমান বা অ্যাক্টিভিজম দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না; প্রকৃত সাংবাদিকতা পরিচালিত হয় বস্তুনিষ্ঠ সত্য ও ডেটাভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে—এমন মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস (দায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬’-এর একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
‘দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যম কি ভিন্ন ভিন্ন রূপে একই ধরনের হুমকির সম্মুখীন হয়?’ শীর্ষক আলোচনায় আরও অংশ নেন হিমাল সাউথ এশিয়ান-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কনক মণি দীক্ষিত, সাবেক প্রেস সচিব ও ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম এবং দ্য হিন্দু-এর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। আলোচনা সঞ্চালনা করেন নেত্র নিউজ-এর নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান।
প্যানেল আলোচনায় তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকতা একজন স্বাধীন সাংবাদিকের চিন্তাভাবনা, পর্যবেক্ষণ ও পেশাদার বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। তবে যে কোনো সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, সাংবাদিকরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও লেখনীর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন, কিন্তু সেই উপস্থাপনা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে হতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর গণমাধ্যম প্রায় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। আগে যেখানে বাকস্বাধীনতা ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়, বর্তমানে প্রযুক্তি ও মোবাইল সাংবাদিকতার বিস্তারের ফলে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য প্রতিরোধ করে জনগণকে বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করাই গণমাধ্যমের অন্যতম বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিকতার সংজ্ঞা ও জনমানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার কোনো একক সংজ্ঞা নেই এবং সময়ের সঙ্গে এর ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সমাজে একটি বিষয় নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে, তবে একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ হলো ব্যক্তিগত আবেগ বা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরা।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সাংবাদিকদের ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ হয়ে ওঠা উচিত নয়। তার মতে, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো উপাত্ত ও প্রমাণনির্ভর সত্য অনুসন্ধান। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো ধারণা বা অনুমান সংবাদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই সমাজকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদচর্চার পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।
প্যানেল আলোচনায় সাবেক প্রেস সচিব ও ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, প্রিন্ট বা টেক্সটভিত্তিক সাংবাদিকতার যুগের তুলনায় বর্তমান ডিজিটাল যুগে সমাজ ও সংবাদকক্ষ উভয়ই বেশি বিভাজনের মুখে পড়েছে। তার মতে, বর্তমানে সাংবাদিকদের প্রায়ই পেশাগত স্বাধীনতা ও আনুগত্যের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
তিনি বলেন, অতীতে সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া বা সেন্সরশিপ আরোপের মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সংবাদকক্ষ বা সাংবাদিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুল আলম বলেন, টেক্সটভিত্তিক সাংবাদিকতার অর্থনৈতিক ভিত্তি আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ এখন দীর্ঘ প্রতিবেদন পড়ার পরিবর্তে ভিডিওভিত্তিক কনটেন্টের প্রতি বেশি আগ্রহী। ফলে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া টেক্সটভিত্তিক সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং তার জায়গা দখল করছে ডিজিটাল ভিডিওমাধ্যম।