মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
পদ্মা নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকা নতুন করে ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর মূল চ্যানেল স্থানান্তরিত হয়ে নতুন শাখা নদী মূল প্রবাহে পরিণত হওয়ায় নদীর তলদেশে গভীর ক্ষয় (স্কাওয়ার) সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাবে নদীতীরের মাটি ধসে গিয়ে একের পর এক জনপদ ভাঙনের মুখে পড়ছে।
ইতোমধ্যে সদর উপজেলার শিলই ও বাংলাবাজার, লৌহজং উপজেলার গাওঁদিয়া ছাড়াও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি, সরিষাবন ও সাতকচর এলাকায় পদ্মার তীব্র স্রোতের প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এসব এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্প চলমান অবস্থায় গাওঁদিয়া এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের একটি অংশে আকস্মিক ভাঙন দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপে দেখা গেছে, গাওঁদিয়া এলাকায় নদীর গভীরতা আগের নকশার তুলনায় অনেক বেড়ে প্রায় ২৫ মিটারে পৌঁছেছে। কারণ, আগে যেখানে পদ্মার শাখা চ্যানেল ছিল, বর্তমানে সেটিই মূল চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। ফলে নদীর প্রবল স্রোতে তলদেশের ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাঁধের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।
একইভাবে শিলই-বাংলাবাজার এলাকায় গত দুই দশক ধরে পদ্মার মূল চ্যানেল ধীরে ধীরে তীরের দিকে সরে এসেছে। ২০২০ সালে ভয়াবহ ভাঙনে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। চলতি বর্ষায় আবারও নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি, সরিষাবন ও সাতকচর এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। পদ্মার মূল প্রবাহ এসব এলাকার আরও কাছে চলে আসায় নদীতীরের ক্ষয় বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী জিওব্যাগের পরিবর্তে দ্রুত স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা না হলে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই জনপদও গাওঁদিয়া কিংবা শিলই-বাংলাবাজারের মতো ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কৃষিজমি ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মার সর্বশেষ হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাঁধের নকশা নিয়মিত হালনাগাদ না করলে ভবিষ্যতে নদীতীর রক্ষা প্রকল্প আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই নদীর পরিবর্তিত গতিপথ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।