সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ও কৃষিপ্রধান জেলা লালমনিরহাটে কৃষকের ঘরে এখন উৎসবের পরিবর্তে হাহাকার বিরাজ করছে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার উত্তাপ, অন্যদিকে আগাম বৃষ্টির প্রভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি—সব মিলিয়ে লালমনিরহাটের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন ঈদুল আযহার আগে কৃষকের হাতে নগদ অর্থের জোগান না থাকায় থমকে গেছে জনজীবন।
তলিয়ে গেছে স্বপ্ন মে মাসের মাঝমাঝি সময়ে হঠাৎ শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে লালমনিরহাটের নিচু এলাকার কয়েক হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ও ভুট্টা তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে জেলায় এ বছর প্রায় ৪৮,৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। যার একটি বড় অংশ এখনও মাঠে। বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে শ্রমিকের অভাব এবং কাটা ধান শুকানোর জায়গার অভাবে অনেক ধান মাঠেই পচতে শুরু করেছে।
প্রায় ৩২,৯১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হওয়া ভুট্টার ৭৫-৮০ শতাংশ কাটা হলেও বাকি অংশ বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। রোদ না থাকায় ভুট্টা শুকাতে না পেরে মান নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি বাজারদরে প্রভাব ফেলছে।
বাজার মন্দা ও সিন্ডিকেটের কারসাজি
তামাক চাষিদের অবস্থা আরও করুণ। কৃষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি নানা অজুহাতে তামাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। প্রতি মণ তামাক গত বছর ৬,৫০০-৫,০০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ২,৮০০-৩,২০০ টাকায় নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচই যেখানে মণে ২,৫০০ টাকার উপরে, সেখানে এই দর কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
এক মাস আগে ভুট্টার মণ ১,১৬০-১,২০০ টাকা থাকলেও বর্তমান আর্দ্রতার দোহাই দিয়ে ফড়িয়ারা তা ১,০০০-১,০২০ টাকায় নামিয়ে এনেছে। প্রতি একরে চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
গো খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া, বিক্রিতে হাহাকার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে লালমনিরহাটের ক্ষুদ্র খামারিরা ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বৈশ্বিক অস্থিরতায় ভুট্টার ভূষি, খৈল ও ফিডের দাম গত এক বছরে প্রায় ৩০-৪০% বেড়েছে। সরকারি হিসেবে এবার দেশে চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই বাড়তি জোগান এবং মানুষের হ্রাসকৃত ক্রয়ক্ষমতার কারণে বাজারে পশুর ন্যায্যমূল্য মিলছে না। কৃষকরা বলছেন, “গরুকে খাওয়াইতে গিয়া ঘটিবাটি বেচার দশা, কিন্তু বাজারে দাম অর্ধেক।”
স্থানীয় কৃষি জৈনিক কর্মকর্তাদের মতে, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপরে তো কারো হাত নেই, তবে সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে। আর এবার কৃষি এবং কৃষকের উপরে সব দিক দিয়েই ব্যাড লাক।”
“ক্ষেতের ভুট্টা পচতাছে, তামাক নিয়া কোম্পানি টালবাহানা করতাছে। গোয়াল ভরা গরু আছে কিন্তু বেচার দাম নাই। এবার ঈদ কেমনে করমু হেই চিন্তা জুইড়া বসছে।” — কালীগঞ্জের কৃষক তপু সিংহ
লালমনিরহাটের কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “তামাক নিয়া কোম্পানি খেলতাছে, ভুট্টা খাইলো বৃষ্টিতে, আর গরু বেইচ্যা ঈদের খরচ তো দূরের কথা, দাদন শোধ করাই দায়।”
সার্বিক পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে। সরকারিভাবে কৃষিপণ্য ক্রয়ের বিশেষ উদ্যোগ এবং তামাক চাষিদের সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। এক বুক দুশ্চিন্তা নিয়ে লালমনিরহাটের কৃষকরা এখন মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন—কখন রোদ উঠবে, আর কখন তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।