আলী আক্কাস মুন্সীগঞ্জ
কেউ বেরিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে। কেউ কর্মস্থল থেকে ছুটে গিয়েছিলেন রাজপথে। কেউ আবার নিজের সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে আর ঘরে ফেরেননি। কেউ ভাতের থালা অসমাপ্ত রেখে ছুটেছিলেন গুলির মুখে। বয়স, পেশা, পরিচয়—সবকিছু আলাদা হলেও তাঁদের শেষ ঠিকানা একটিই—জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাস।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন জেলার মতো মুন্সীগঞ্জও দিয়েছে আত্মত্যাগের উজ্জ্বল নজির। জেলার অন্তত ১৬ জন মানুষ জীবন দিয়েছেন। তাঁদের কেউ ছিলেন শিক্ষার্থী, কেউ শ্রমিক, কেউ দিনমজুর, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ প্রবাসফেরত, আবার কেউ রাজনৈতিক কর্মী। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে থেমে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিভে গেছে একটি জীবনের সম্ভাবনা।
শ্রীনগরের উত্তর কোলাপাড়া গ্রামের সাইদুল ইসলাম শোভন ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণ। শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের এই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১৯ জুলাই ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের সময় তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। পরে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় নামকরণ করা হয় “বীর শহীদ শোভন চত্বর”।
একই দিনে উত্তরার রাজপথে প্রাণ হারান শ্রীনগরের কাশেমনগরের আল আমিন খলিফা। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ বড় ভাইয়ের সঙ্গে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন। রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড তাঁকে আন্দোলনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উত্তরায় পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলেও আর ফিরে আসেননি।
লৌহজংয়ের কুমারভোগ ইউনিয়নের মৌছা গ্রামের রাকিব হোসেন ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। আন্দোলনে একের পর এক প্রাণহানির খবর দেখে মাকে বলেছিলেন, “সব মানুষ মাইরা ফেলতাছে, আমাকে যাইতে হবে।” সেই যাওয়াই ছিল তাঁর শেষ যাত্রা। আফতাবনগরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি।
একই উপজেলার ঘোড়দৌড় গ্রামের সোহেল রানা ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ির দক্ষিণ কাজলা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। দীর্ঘ ৩৪ দিন পর পরিবার জানতে পারে, নির্যাতনের পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলেও পরে তাঁর কবরের সন্ধান পায় পরিবার।
গজারিয়ার বড় রায়পাড়ার মেহেদী হাসানের স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিতে নিহত হন। মৃত্যুর পর প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, ডিপ্লোমা পরীক্ষায় তিনি ৪-এর মধ্যে ৩.৪২ জিপিএ অর্জন করেছিলেন।
মিরকাদিম পৌরসভার রামগোপালপুর এলাকার ছাত্রদল নেতা শারিক চৌধুরী মানিক ৫ আগস্ট “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চানখারপুলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। বিজয়ের দিনটি তিনি দেখে যেতে পারেননি, তবে তাঁর কফিন জড়িয়ে ছিল লাল-সবুজের পতাকা।
মুন্সীগঞ্জ সদরের সুখবাসপুর গ্রামের ফরিদ শেখ দীর্ঘ সংগ্রামের পর কলার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৬ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধির আক্কাস আলী ছেলেকে খুঁজতে বের হয়েছিলেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া সন্তান ফিরলেও বাবা আর ঘরে ফেরেননি। যাত্রাবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
সিরাজদিখানের মধ্যপাড়ার এসএসসি পরীক্ষার্থী মোস্তাফা জামান সমুদ্র জুমার নামাজের কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর গন্তব্য ছিল আন্দোলনের মিছিল। রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তাঁর। পরে রাতের আঁধারে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
লৌহজংয়ের কুমারভোগের মেহেদী হাসান প্রান্তের স্বপ্ন ছিল জাপানে পড়াশোনা করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯ জুলাই কদমতলীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। মৃত্যুর পর দাফন নিয়েও পরিবারকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।
গাওদিয়ার বাবুল হাওলাদার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই আন্দোলনে নেমেছিলেন। রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নয় দিন চিকিৎসাধীন থেকে ২৮ জুলাই তিনি মারা যান।
মাত্র ১৬ বছর বয়সী আশরাফুল ইসলাম অন্তর ছিলেন মায়ের একমাত্র সন্তান। ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ি থানার সামনে বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। দুই দিন পর ঢাকা মেডিকেলে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করে পরিবার।
গজারিয়ার ইমামপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান সরকার দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফিরে আন্দোলনের সময় কদমতলী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার হারায় তাদের একমাত্র অভিভাবককে।
মুন্সীগঞ্জ শহরের সেই রক্তাক্ত ৪ আগস্ট
৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ শহরও প্রত্যক্ষ করে ভয়াবহ সহিংসতা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাকে সকাল ১০টায় ইসলামপুর ও ইদ্রাকপুর মোড় থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হওয়ার পর হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়।
কৃষি ব্যাংক এলাকা থেকে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও মানিকপুর সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা সাত ঘণ্টা চলে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণ। হাসপাতাল ও মুক্তারপুর এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে হামলার অভিযোগও ওঠে। আহত হন অসংখ্য মানুষ।
সেদিন শহীদ হন ইসলামপুর এলাকার নূর মোহাম্মদ সরদার (ডিপজল-১৭), রিয়াজুল ফরাজী (৩৫) এবং মো. সজল।
কিশোর ডিপজল প্রথম গুলিতেই প্রাণ হারান। এরপর নিহত হন দিনমজুর রিয়াজুল ফরাজী। তাঁর মৃত্যুতে দুই কন্যাসন্তান পিতৃহারা হয়।
শ্রমিক সজলের আত্মত্যাগ আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে। ভাইয়ের সঙ্গে ভাত খাওয়ার সময় গুলির শব্দ শুনে তিনি খাবার অসমাপ্ত রেখেই বাইরে ছুটে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বের হওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, “হয় আজকে শহীদ হমু, নয় স্বাধীন।” প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ছাত্র-জনতাকে রক্ষা করতে তিনি দুই হাত প্রসারিত করে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন।
সাত ঘণ্টার সংঘর্ষ শেষে শহরের রাজপথজুড়ে পড়ে ছিল ইট-পাটকেল, গুলির খোসা ও রক্তের দাগ। পরে ছাত্র-জনতা সুপারমার্কেট চত্বরের নাম দেয় “শহীদ চত্বর”।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মুন্সীগঞ্জের ১৬ শহীদের আত্মত্যাগ কেবল একটি জেলার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, স্বজনদের অশ্রু এবং আত্মত্যাগ সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে জাতির স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।