সেলিম রেজা, শেরপুর (বগুড়া) থেকে:
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের শুবলি এলাকার বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে এখন কেবলই থৈ থৈ পানি। অথচ এই সময়ে সবুজ ধানের শিষ কিংবা মৌসুমি সবজিতে ভরে থাকার কথা ছিল শত শত একর জমি। শুবলি সিঙ্গাইর বিল থেকে আধবিলা হয়ে বোয়ালকান্দি ব্রিজ পর্যন্ত প্রবাহিত প্রাকৃতিক খালটি
দীর্ঘদিন ধরে পুনঃখনন না করায় এবং স্থানীয় দখলের কবলে পড়ে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে পানি নিষ্কাশনের পথ। সামান্য বৃষ্টিতেই বিল ও সংলগ্ন ফসলি জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিচ্ছে, আর বর্ষার পানি মাসের পর মাস আটকে থেকে নিঃস্ব করছে স্থানীয় শত শত কৃষককে।
দখল ও পলি ভরাট: একটি খালের করুণ পরিণতি
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই খালটি ছিল ওই অঞ্চলের প্রধান জলপথ ও কৃষি সঞ্জীবনী। বর্ষাকালে বিলের উদ্বৃত্ত পানি এই খাল দিয়ে অনায়াসে প্রবাহিত হয়ে মূল নদীতে গিয়ে পড়ত।
কিন্তু বছরের পর বছর কোনো ধরনের সংস্কার না হওয়া, পলি জমতে থাকা এবং একশ্রেণির অবৈধ দখলদারের খামখেয়ালিতে খালটির স্বাভাবিক নাব্য একেবারে শূন্যে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে খালের বুকজুড়ে এখন কচুরিপানা আর পলিমাটির আস্তরণ; সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানি সরার কোনো বিকল্প পথ থাকে না।
কৃষকের কান্না ও অর্থনৈতিক মাশুলঃ
মাঠে জমে থাকা পানির দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াতেই ক্ষোভ আর হাহাকার ফুটে ওঠে শুবলী গ্রামের কৃষক মো. শাহ আলমের গলায়। তিনি বলেন, “আকাশে মেঘ জমলেই আমাদের বুকে কাঁপন ধরে। একটু বৃষ্টি হলেই জমিতে পানি জমে যায়।
পানি বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় ধান, সবজি সব পচে শেষ। খালটা খনন না হলে আমাদের না খেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।”
একই গ্রামের কৃষক শাহাদাত হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, পানি জমে থাকার কারণে প্রতি বছর শত শত একর উর্বর জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা দেনার দায়ে জর্জরিত হচ্ছেন, অন্যদিকে জাতীয় কৃষি উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়ে রাজস্ব ক্ষতিও হচ্ছে বিপুল পরিমাণ।
প্রশাসনের বক্তব্য ও সমাধানের আশ্বাসঃ
কৃষি খাতের এই বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফারজানা আক্তার বলেন, “পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক।
খালটি খনন করা হলে জমে থাকা পানি দ্রুত নেমে যাবে এবং কৃষকরা নির্বিঘ্নে সময়মতো ফসল ফলাতে পারবেন। ভুক্তভোগী কৃষকেরা যদি যৌথভাবে কৃষি অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেন, আমরা দ্রুত সরজমিনে পরিদর্শন করে প্রাক্কলন তৈরি ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেব।”
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু জানান, “এলাকাবাসীর এই দুর্দশা ও দাবির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। খালটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের (পানি উন্নয়ন বোর্ড বা এলজিইডি) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে এটি পুনঃখনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”