সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তার গ্রেপ্তারের মাত্র চার দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এ প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিলম্ব করা হয়নি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ১৪৭ বিধিতে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের উত্থাপিত সাধারণ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিবি ঢাকাকে জানায়, বেনজীরকে সেখানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউএইর আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের পর ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার ৩০ দিন অপেক্ষা করেনি। গ্রেপ্তারের মাত্র চার দিনের মাথায় ১৬ জুন কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়। একই দিনে এর অনুলিপি এনসিবি আবুধাবিতেও পাঠানো হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ কারণে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সরকার বিলম্ব করেছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউএইর অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিকতার (রেসিপ্রসিটি) নীতির ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ৮ জুলাই ইউএইর বিচার মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য ও নথি চায়। এর মধ্যে পারস্পরিকতার নিশ্চয়তা, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, মামলার আইনি সীমাবদ্ধতা-সংক্রান্ত তথ্য এবং সত্যায়িত গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন নথি ছিল।
এসবের অতিরিক্ত সহায়ক নথি ৪ আগস্ট কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হয়। এরপর ২২ আগস্ট ইউএই কর্তৃপক্ষ আরও কিছু আইনি ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট আইনের পূর্ণাঙ্গ পাঠ চায়। এসব বিষয়ে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জবাব দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আইন ও বিচার বিভাগের মতামত ১ সেপ্টেম্বর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতামত ২ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেছে। বর্তমানে সমন্বিত জবাব প্রস্তুত, সত্যায়ন ও আরবি অনুবাদের কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
বেনজীরকে দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য গত ৩০ জুলাই আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ‘হ্যামদান আল কবির অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বেনজীর ইউএই থেকে সেন্ট লুসিয়ায় চলে গেছেন—এমন সংবাদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই শুধু গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন হবে না।
তিনি বলেন, বেনজীরের অবস্থান অন্য কোনো দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, চুক্তি বা পারস্পরিকতার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় তাকে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে ছয়টি দেশের পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে দুদকের পৃথক মামলা রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই মামলায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসামি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশে থাকা বেনজীর ও তার পরিবারের সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএ) পাঠানো হয়েছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসব সম্পদ অবরুদ্ধ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বেনজীরের জামিন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জামিন পাওয়া মানেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রত্যর্পণ একটি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া এবং এর বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইনগত ও কূটনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।