গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনে আরও দুটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিল তিনটি উত্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিল উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। পরে বিলগুলো অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
গুমের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’-এ গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিজ পরিচয়ে কিংবা সরকারের সমর্থনে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে তার স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করলে বা তার অবস্থান গোপন রাখলে তা গুম হিসেবে বিবেচিত হবে।
গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া গুমের অভিযোগ তদন্তে সর্বোচ্চ ১২০ দিন এবং বিচার শেষ করতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না।
বিলে গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান, ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করা, সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যা গুমের অভিযোগের জন্য পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের প্রস্তাবও রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের কিছু ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা আগের অধ্যাদেশের তুলনায় সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
বিলে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে স্পিকারকে সভাপতি করার পাশাপাশি আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের মনোনীত সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের রাখার কথা বলা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনেও সংশোধনী
১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ সন্তান বা নাতি-নাতনিকে এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তির ভোগাধিকার তার ওয়ারিশদের কাছে যাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, নতুন বিধানটি সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে এবং প্রচলিত দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিতে এর প্রভাব পড়বে না।