মো. বদরুল আলম বিপুল, সখীপুর (টাঙ্গাইল)
বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই সখীপুরে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত তিন চাকার অটোরিকশা (স্থানীয়ভাবে যা অটো নামে পরিচিত) কিনে চালানো শুরু করছেন অনেকে। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কিংবা সড়কে গাড়ি চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা। ফলে যাত্রী ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে হঠাৎ ব্রেক করা, সড়কে অবস্থান পরিবর্তন ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ একাধিক জনের।
সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী এই অটো চালকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেকেই বিদেশে থাকা অবস্থায় দেশে ফেরার পর অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন অথবা পুরাতন অটো কিনে চালানো শুরু করেন। কিন্তু গাড়ি চালানোর আগে তাঁদের দক্ষতা যাচাই বা প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা থাকে না।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান নোমান বলেন, তাঁর পরিচিত মো. সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বিদেশ থেকে দেশে ফেরার এক/দুই সপ্তাহের মধ্যেই একটি অটো কিনে চালানো শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের যেতে না যেতেই সেটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং গাড়িটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। একইভাবে কালাম মিয়া নামের আরেক পরিচিত ব্যক্তিও বিদেশ থেকে দেশে ফিরে অটো কিনে চালানো শুরু করেন। পরে তিনিও দুর্ঘটনার শিকার হন।
নোমান আরও বলেন, অটোচালকদের বড় একটি সমস্যা হলো সড়কে চলাচলের মৌলিক নিয়ম না মানা। বিশেষ করে কোনো যাত্রীকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেই অনেক চালক পেছনে বা সামনে থাকা যানবাহন আছে কিনা বিবেচনা না করে হঠাৎ ব্রেক করেন। উনারা অনেক সময় খালি অটো রাস্তার বিপরীত পাশে যাত্রী দেখলেই ওঠানোর জন্য কোনো ধরনের ইঙ্গিত বা সংকেত না দিয়েই গাড়ি অন্য পাশে নিয়ে যান। এতে পেছন থেকে আসা মোটরসাইকেল, অন্য অটো,ভ্যান কিংবা অন্য যানবাহনের চালকরা দুর্ঘটনার শিকার হন। আমি মোটরসাইকেল নিয়ে অফিসে যাতায়াত করি। আমার মোটরসাইকেলের সাথে কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে। মোটরসাইকেলের সামান্য ক্ষতিও হয়েছে।
পথচারী আয়নাল, শফিক, মোস্তফা, আরাফাত’সহ আরো অনেকে বলেন, সড়কে হঠাৎ অটো থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে প্রায়ই যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার অনেক অটো চালক অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করেন। ভাঙা বা ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ না করায় কখনো গাড়ি উল্টে যাচ্ছে। আবার কখনো অন্য যানবাহন বা পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। শুধু অটো যাত্রী নয়, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরাও এসব দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বাজার ও জনবহুল এলাকায় যাত্রী ওঠানামার সময় হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দেওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে।
বিদেশ ফেরত অটোচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, তিন চাকার গাড়ি জোরে চালালে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। চেষ্টা করি আস্তেধীরে দেখেশুনে চালাতে। নিজের এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে। বসে থাকলে খরচ হয় জমানো টাকা শেষ হয়ে যায় তাই বাধ্য হয়ে এটা কিনছি। যেন প্রতিদিনের বাজার খরচ চলে।
উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, তিন চাকার অটো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গাড়ির ফিটনেস, চালকের দক্ষতা এবং নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলার বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো দরকার।
তিনি আরো বলেন, একজন নতুন চালককে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই ছাড়া সরাসরি সড়কে গাড়ি চালানোর সুযোগ দেওয়া হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সখীপুর থানা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. এমারত হোসেন বলেন,
অটোরিকশা চালকদের অনেকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত উপজেলার কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে চালকদের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সখীপুর তালতলা চত্বরে নিয়মিত দুজন ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা গেলে যানজটের পাশাপাশি অটোরিকশার হঠাৎ মোড় নেওয়া, সাইড দেওয়া ও আকস্মিক ব্রেক করার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুরাদ হোসেন বলেন, অটোচালকদের বিষয়ে আমরা শিগগিরই মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলব। অনভিজ্ঞ চালকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সমাবেশ ও আলোচনা করা হবে। সেখানে কীভাবে আরও সতর্ক ও নিরাপদভাবে গাড়ি চালানো যায়, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করা হবে। পাশাপাশি উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যারা অসতর্কভাবে নিয়ম না মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে টাংগাইল জেলার বিআরটিএ এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম বলেন, এসব তিন চাকার অটো বিআরটিএ এর আওতাভুক্ত নয় এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের কোনো ব্যবস্থা নেই।