ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ‘সেন্টকম’ দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে হুমকি তৈরি করা ইরানের একাধিক আত্মঘাতী ড্রোন প্রতিহত করার অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দর আব্বাসের ওই ঘাঁটি থেকে ইরান পঞ্চম একটি ড্রোন উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন বাহিনী লক্ষ্যভেদী হামলা চালায়। সেন্টকমের দাবি, অভিযানে ইরানের চারটি একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে মার্কিন এই হামলাকে সরাসরি যুদ্ধবিরতির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং চলমান আলোচনাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হেনেছে। যদিও কোন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ইরান।
একই সময়ে কুয়েতের সেনাবাহিনীও নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর দাবি, কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি প্রতিহত করা হয়েছে। তবে সেগুলো কোন দিক থেকে আসছিল, তা স্পষ্ট করেনি কুয়েত। ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল জোট ও ইরানের সংঘাত বন্ধে যে আলোচনা চলছিল, এই নতুন হামলার পর তা কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে। যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে নাকি আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নেবে—তা নিয়ে এখন গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
এর আগেও গত সোমবার দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর অভিযোগে ইরানি স্পিডবোটগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। সেন্টকম তখন দাবি করেছিল, ওই অভিযান ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি রক্ষার অংশ।
শুধু সামরিক অভিযান নয়, অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের অভিযোগে ইরানি সংস্থা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’র ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, এটি ইরানের অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথকে ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের চেষ্টার প্রমাণ।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
এদিকে ওয়াশিংটনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় থেকে চুক্তির চেষ্টা করছে। তবে ওয়াশিংটন এখনো তাদের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সমঝোতা না হলে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সম্প্রতি সম্ভাব্য একটি খসড়া চুক্তির তথ্য প্রকাশ করলেও হোয়াইট হাউস সেটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট দাবি করেছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ যতটা সামনে এগোচ্ছিল, নতুন হামলা ও পাল্টা হুমকির পর তা আবারও অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?