সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
জাতীয় পর্যায়ে ইউরিয়া সারসহ অন্যান্য রাসায়নিক সারের পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্রের কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং সীমান্ত দিয়ে ভারতে সার পাচারের অপচেষ্টা থামছে না। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে পৃথক বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১০০ কেজি ইউরিয়া সার এবং একটি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (তিস্তা ব্যাটালিয়ন ৬১ বিজিবি)।
গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) শফিরহাট বিওপির টহলদল জিরো লাইন থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ‘দক্ষিণ হোসনাবাদ’ এলাকায় অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০০ কেজি ইউরিয়া সার উদ্ধার করে।
অপর অভিযানে ধরলা বিওপির টহলদল জিরো লাইন থেকে ২০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ‘উত্তর বর্ডার’ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় একটি ভারতীয় গরু আটক করে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, জব্দকৃত সার ও গরুর সর্বমোট সিজার মূল্য ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে সার আটকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পাচারকারী চক্রের এই ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ২৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে বিজিবি ২৫ ব্যাটালিয়ন ভারতে পাচারের চেষ্টাকালে ট্রাকে ভর্তি ২৪ টন (৪৮০ বস্তা) ইউরিয়া সার জব্দ করে।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর দেওয়ানগঞ্জের বর্ডার এলাকায় বিজিবি ৩৫ ব্যাটালিয়ন ভারতে পাচারকালে ১৩ বস্তা সার আটক করে। এছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর ভোলা কোস্টগার্ড নদীপথে পাচারের সময় ৮,০০০ কেজি (১৬০ বস্তা) ইউরিয়া সারসহ একটি স্টিল বডি ট্রলার জব্দ করে। সম্প্রতি ১২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম উপকূলে কোস্টগার্ডের অভিযানে ৭০০ বস্তা এবং দিনাজপুর খানসামায় যৌথ অভিযানে ১,৫৭৭ বস্তা অবৈধ সার জব্দ করা হয়।
বাংলাদেশ থেকে মূলত ভারতে ইউরিয়া সার পাচার হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার অস্বাভাবিক মূল্যের পার্থক্য ও সীমান্তপারের চড়া চাহিদা। বাংলাদেশ সরকার কৃষি খাতকে চাঙা রাখতে ইউরিয়া সারে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দেয়, যার ফলে দেশে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের নির্ধারিত সরকারি মূল্য মাত্র ২৭ টাকা (৫০ কেজির বস্তা ১,৩৫০ টাকা)।
বিপরীতে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ইউরিয়া সারের খোলাবাজারের দাম এবং চাহিদা তুলনামূলক অনেক বেশি।
সরকারি বিপুল ভর্তুকির কারণে বাংলাদেশে সারের দাম কম থাকায় সীমান্ত এলাকার একশ্রেণীর অসাধু ডিলার, ব্যবসায়ী ও চোরাচালান সিন্ডিকেট বেশি মুনাফা লাভের আশায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে সার পাচারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তারা স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত দামে কিংবা সামান্য বেশি দামে সার সংগ্রহ করে চোরাইপথে ভারতে পার করে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির টাকা ভেস্তে গিয়ে অন্য দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে প্রান্তিক কৃষকদের কৃত্রিম সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।
অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার চেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে। আসন্ন রবি ও বরো মৌসুমে বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন, বিপরীতে মজুত রয়েছে ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টন।
টিএসপি সারের চাহিদা ৪ লাখ ৬৭ হাজার টনের বিপরীতে মজুত ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন, ডিএপি সারের ১০ লাখ ২৩ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং এমওপি সারের ৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে ১১ লাখ টন মজুত রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দেশে বর্তমানে মোট ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন সার মজুত রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন বেশি।
তা সত্ত্বেও সীমান্ত এলাকায় সারের এই অবৈধ পাচারের কারণে স্থানীয় বাজারগুলোতে সারের কৃত্রিম অভাব দেখা দিচ্ছে এবং কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
সীমান্তে সারসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ চোরাচালান, মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিস্তা ব্যাটালিয়ন (৬১ বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা ও জাতীয় সম্পদ পাচার রোধে তাদের নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।