চলনবিলে পানি কমতে শুরু করেছে। আর এ সময় মাছ ধরতে আত্রাই নদী ও বিলের বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে সোঁতিজাল। বাঁশ ও বেড়া দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে মাছ ধরার এই পদ্ধতিতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো পানি না নামলে সরিষা, রসুন ও গমসহ রবিশস্যের আবাদ ব্যাহত হবে।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় বারবার অভিযান চালিয়েও থামানো যাচ্ছে না অবৈধ সোঁতিজালের ব্যবহার। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ ও পুড়িয়ে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর আবারও বসানো হচ্ছে সোঁতি। এ ঘটনায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আত্রাই নদী ও চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে বাঁশ পুঁতে এবং তালাইয়ের বেড়া দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে সোঁতিজাল বসানো হয়েছে। সাবগাড়ি বাজার এলাকায় আব্দুল মান্নানের সহযোগীরা সোঁতিজাল বসিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। জ্ঞানদানগর সামাদের ঘাট এলাকায় রবি মিয়ার এবং হরদমা বিলেও সোঁতিজাল দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সোঁতিজালের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের পাশাপাশি জালে আটকা পড়ছে জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। এতে দেশীয় মাছের চলাচল ও প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে রবিশস্য বোনার সময় ঘনিয়ে আসায় উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। কৃষক মকুল বলেন, জমি থেকে সময়মতো পানি না নামলে সরিষা ও রসুনের আবাদ করা সম্ভব হবে না। সোঁতিজাল ও কচুরিপানার কারণে অনেক জায়গায় পানি আটকে আছে।
কৃষক গোলাপ মণ্ডল, নাজমুল হক, জিয়াউর ও হান্নানসহ স্থানীয় কয়েকজন বলেন, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে মাছ ধরার কারণে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে ছিটিয়ে বোনা সরিষা, রসুন, গমসহ বিভিন্ন রবিশস্যের আবাদ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁরা দ্রুত অবৈধ সোঁতিজাল অপসারণের দাবি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোঁতিজালের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না বলেও জানান স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান বলেন, তাঁর সোঁতি আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে সরেজমিনে সেখানে সোঁতির কাঠামো দেখা গেছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রতন চন্দ্র সাহা বলেন, সোঁতিজাল উচ্ছেদে মাঝেমধ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উচ্ছেদের পরপরই এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। জড়িত ব্যক্তিরা আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের আটক করা বা প্রচলিত আইনে মামলা দেওয়া যাচ্ছে না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, শুধু প্রশাসনের অভিযানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্থানীয়দেরও সচেতন হতে হবে। একটি সোঁতিজাল উচ্ছেদ করা বেশ ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। স্থানীয়রা শুরুতেই প্রশাসনকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, নদীর বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকভাবে সোঁতিজাল বসানো রয়েছে। এক বা দুই দিনের মধ্যে সব অপসারণ সম্ভব নয়। তবে গুরুদাসপুর উপজেলা মৎস্য অফিসকে দ্রুত সোঁতিজাল অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার উচ্ছেদের পরও যদি সোঁতিজাল আবার বসানো হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে চলনবিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও কৃষিজমি রক্ষা হবে কীভাবে?