মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় বাজারে বর্ষা মৌসুম এলেই জেগে ওঠে প্রায় দুই শতকের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পাটের হাট। পদ্মা নদীর বুকে সারি সারি ট্রলারে সাজানো থাকে সোনালি আঁশের পাট।
ভোরের আলো ফুটতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ট্রলারভর্তি পাট নিয়ে হাজির হন এই হাটে। ট্রলারের ওপর দাঁড়িয়েই চলে দরদাম, কেনাবেচা ও পাট তোলা-নামানোর ব্যস্ততা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই ভাসমান হাট আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রতি বছর জুনের মাঝামাঝি থেকে প্রায় তিন মাস ধরে সপ্তাহে দুই দিন—শুক্রবার ও সোমবার—এ হাট বসে।
প্রতিটি হাটে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মণ পাট বিক্রি হয়। পাটের মান অনুযায়ী প্রতি মণের দাম থাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। ফলে প্রতি হাটেই এক কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সোমবার সকালে হাট ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা নদীতে শতাধিক ট্রলার নোঙর করে আছে। কোথাও কৃষক পাট নামাচ্ছেন, কোথাও আবার পাইকাররা পাটের আঁশ পরীক্ষা করে দরদাম করছেন। ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহলে নদীর পাড় যেন এক প্রাণচঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
শরীয়তপুরের কাঁচিকাটা এলাকার পাটচাষি সবুজ দেওয়ান বলেন, “আমাদের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে এই হাটে পাট বিক্রি করে আসছে। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে এখানে আসতাম। এখন নিজেই পাট নিয়ে আসি। অন্যান্য বাজারের তুলনায় এখানে ভালো দাম পাওয়া যায় বলেই প্রতি বছর আসি।”
রাজাবাড়িচর এলাকার কৃষক মাসুদ হালদার জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও এ বছর পাটের বাজার তুলনামূলক ভালো। তিনি এদিন ১২ মণ পাট প্রতি মণ ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন।
মুন্সীগঞ্জের পাটচাষি ও ব্যবসায়ী দাদন খালাসী বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি হাটে পাটের চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দাম মিলছে। নিজের উৎপাদিত পাটের পাশাপাশি অন্য কৃষকদের কাছ থেকে কিনেও তিনি বিক্রি করছেন।
নারায়ণগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহাদাত বেপারী বলেন, উন্নত মানের পাটের দাম এবার ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মাঝারি মানের পাট ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং নিম্নমানের পাট ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় কেনা হচ্ছে। ভালো দামের কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জ সদর থেকে বাবার সঙ্গে পাট কিনতে আসা তরুণ ব্যবসায়ী রিফাত বলেন, “এটি আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। ভাসমান এই হাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ট্রলার থেকেই পাট কিনে সরাসরি নৌপথে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যায়। এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই কম লাগে।”
দিঘিরপাড় বাজার পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, প্রায় ২০০ বছরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ ও গর্ব জড়িয়ে আছে। বাজার কমিটি দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, দিঘিরপাড়ের ভাসমান পাটের হাট শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার যুগেও শতবর্ষের এই হাট আজও কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক হয়ে টিকে আছে।