শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের চক খানপুর গ্রামে গর্জে উঠেছে প্রমত্তা বাঙ্গালি নদী। তীব্র ভাঙনে চোখের সামনে একের পর এক ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও শৈশবের স্মৃতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীতে। ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে গ্রামের মানুষগুলোর চোখে ঘুম নেই; কেটে যাচ্ছে আতঙ্কিত নির্ঘুম রাত।
একসময় প্রায় ১৩০টি পরিবার নিয়ে চক খানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়া ছিল একটি প্রাণচঞ্চল ও সমৃদ্ধ গ্রাম। হাঁকডাক, কোলাহল আর সবুজ খেতের হাসিতে ভরা গ্রামটিতে এখন নেমে এসেছে শ্মশানের নীরবতা। ভাঙনের নিষ্ঠুর থাবায় ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে গ্রাম ছেড়ে গেছে ৭০টি পরিবার। বর্তমানে হাওলাদার পাড়ায় টিকে থাকা বাকি ৬০টি পরিবারও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও চরম ঝুঁকির মধ্যে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীকূলের পরিবারগুলো এখন তাদের ভিটেমাটি ও শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় আকুল আকুতি জানাচ্ছে। রাত নামলেই বাড়ে নদীর গর্জন আর ভাঙনের আতঙ্ক। কখন যে বাপের ভিটেটুকু নদীর পেটে চলে যায় এই ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।
এতদিন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল, সরকারি উদ্যোগে হয়তো স্থায়ী নদীশাসন বা ভাঙনরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সেই আশায় বুক বেঁধে তারা নিজেদের পৈত্রিক ভিটায় টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু চলতি বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি তাদের সেই প্রত্যাশা। কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এবারের বর্ষাতেও নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
প্রতি রাতেই তাদের মনে একটাই শঙ্কা এই বুঝি নদীর গর্ভে হারিয়ে যাবে শেষ আশ্রয়টুকুও।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু চলতি বছরেই নদীর তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই ভাঙন নতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বাড়ছে। নদীর একেবারে কিনারায় বসবাস করা পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট বসতভিটাও নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
ভূক্তভোগী মংলা চন্দ্র হাওলদার (৫৫) বলেন, “চোখের সামনে নদী সব গিলে খাচ্ছে। সারাজীবনের কষ্টে গড়া ঘরটা এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। দিন-রাত শুধু একটাই ভয় কখন ঘুম থেকে উঠে দেখব, ঘরটা আর নেই। আমরা গরিব মানুষ, ভিটেমাটি হারালে মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না।”
উজ্জ্বল সরকার (৩৫) বলেন, “নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে , তার জন্যেই এ বছর ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে । আমরা চিৎকার করলেও কেউ শুনে না। একদিকে নদী ঘর কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সংসার চালানোর চিন্তা। মনে হয়, গরিবের কান্নার কোনো দাম নেই।”
নদী শুধু ভিটেমাটি নয়, কেড়ে নিচ্ছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের শেষ আশ্রয়টুকুও। নতুন করে জীবন শুরু করার শক্তি বা সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না; তাই ভিটেমাটি হারানোর ভয় তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
শ্রীমতী সবরী রানী (৪৫) বলেন, “পাশের বাড়িগুলো একে একে নদীতে চলে যেতে দেখেছি। এখন নিজের বাড়ির পালা। প্রতিদিন বুক ধড়ফড় করে আজ বুঝি আমাদের ঘরটাও নদীতে মিশে যাবে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই উত্তর আমাদের জানা নেই।”
বাঙ্গালী নদীর ভাঙনে সব হারানোর পথে পথযাত্রী প্রভাতী রানী (৮০) বলেন, “এই বয়সে আর কোথায় যাব বাবা? স্বামীর রেখে যাওয়া এই ভিটাতেই সারাজীবন কাটিয়েছি। এখন যদি এটুকুও নদী নিয়ে যায়, তাহলে শেষ বয়সে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। ভগবান জানেন, আমাদের কপালে কী আছে।”
এ নদী ভাঙ্গন বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন, “ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা আমরা খুব দ্রুত পরিদর্শন করবো এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করে যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নিমিত্তে যদি জিও ব্যাগ বা কোন প্রটেকশন ওয়ার্ক লাগে সেই জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”