নানা সংকট আর গভীর চ্যালেঞ্জে শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলা। শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দ্রব্যমূল্যের আগুন, জ্বালানি ঘাটতি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি আর বিদেশে অর্থপাচার ছিল প্রধান ব্যাধি। সেই দুঃশাসনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট যখন শুরু হয় নতুন যাত্রা—জনগণের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। এক বছর পর সেই অভ্যুত্থানের বিজয় উৎসবে আবারো রাজপথে লাখো মানুষের ঢল, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই এক বছরে কতটা এগোল বাংলাদেশ?
তথ্য-উপাত্ত বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে শূন্য হাতে শুরু করে দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তির জায়গায় আনতে পেরেছে। মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ বিলিয়নে, প্রবাসী আয় রেকর্ড ছাড়িয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, আর লুটপাট-অর্থপাচার আগের তুলনায় কমেছে। বিদ্যুৎ, সার ও পরিবহন খাতে পুরনো ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ শোধ করেছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে বলেন,
“বাবা আমাকে দেউলিয়া করে দিয়ে গেছে। সন্তান হিসেবে তো আমাকে ঘুরাতে হবে। আমি সেই ঘুরানোর চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরকে টেকসই করে তুলতে বড় ধরনের রিফর্ম হাতে নেওয়া হয়েছে।”
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন,
“আমরা খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসেছি। এখন আর অর্থনীতি পড়ার সম্ভাবনা নেই, বরং একটি স্বাভাবিক ধারায় ফেরত আসছে দেশ।”
তবে বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে স্বপ্নে জনতা এক বছর আগে শাসন বদলের রায় দিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বললেই চলে। দুই শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকই অকপটে স্বীকার করেছেন, এই খাতগুলোতে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
প্রশ্ন রয়ে যায়—জনগণ ভালো আছে কি? রাজপথে নেমে মানুষ প্রশ্ন করছে, দ্রব্যমূল্যের স্বস্তির হিসাব যদি তথ্যে থাকে, বাজারে কেন নেই তার প্রতিফলন? বেকারত্বের কষাঘাতে যখন লাখো তরুণ দিশেহারা, তখন শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে উন্নয়ন দেখানো কি যথেষ্ট?
স্বীকার করতেই হবে, অন্তর্বর্তী সরকার ভয়াবহ এক অর্থনৈতিক মৃত্যু উপত্যকা থেকে দেশকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সামনে যে পথ তার চেয়েও কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিজেই বলছেন,
“পরবর্তী সরকারকে সুযোগ দিতে হবে।” অর্থাৎ অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারার অব্যাহত প্রয়োগ প্রয়োজন।
এই এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রমাণ করেছে যে, কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দরকার আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি—জনগণের সঙ্গে সৎ থাকা।