বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কুষ্টিয়া কার্যালয়ে সহকারী মোটরযান পরিদর্শক রিফাত হোসাইনকে ঘিরে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ঘুষ, হয়রানি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। ফিটনেস ও নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, সেবা দিতে গড়িমসি, বিভিন্ন অজুহাতে আবেদন বা কাগজপত্র ফিরিয়ে দেওয়া এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে সেবা নিতে গেলে বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আটকে দেওয়া হয়। এতে একই কাজের জন্য সেবাগ্রহীতাদের একাধিকবার বিআরটিএ কার্যালয়ে আসতে হয়। তবে অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হলে একই কাজ সহজে করে দেওয়া হয়।
বিশেষ করে গাড়ির ফিটনেস ও নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। তাদের ভাষ্য, কোনো কাগজপত্রে সমস্যা থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ রয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের আরও অভিযোগ, প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে কিংবা কোনো সমস্যার বিষয়ে কথা বলতে গেলে রিফাত হোসাইনের আচরণ অসৌজন্যমূলক হয়ে ওঠে। সরকারি সেবা নিতে এসে একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
রিফাত হোসাইনকে ঘিরে অভিযোগ কুষ্টিয়ায় নতুন কিন্তু এর আগে তিনি যশোর বিআরটিএতে কর্মরত থাকার সময়ও তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও দালালনির্ভর সেবা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর যশোর বিআরটিএ কার্যালয়ে ঘুষ ছাড়া সেবা না পাওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান পরিচালিত হয়। ওই অভিযানে পাঁচজন দালালকে আটক করা হয় এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছদ্মবেশী কর্মকর্তারা সেবা নিতে গিয়ে দালালের মাধ্যমে ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হয়। একইসঙ্গে বিআরটিএ কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়।
যশোর দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন জানিয়েছিলেন, অভিযানে আটক দালালদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদন এখনো তাদের কাছে ফেরত আসেনি বলে তিনি জানান।
এদিকে রিফাত হোসাইন যশোরে কর্মরত থাকার সময় তাকে ঘিরে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এসব প্রতিবেদনে দালালের মাধ্যমে কাজ করানো এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া যশোরে কর্মরত থাকার সময় রিফাত হোসাইনকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিআরটিএ কার্যালয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এক তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওই তরুণী ও তার পরিবারের সদস্যরা যশোর বিআরটিএ কার্যালয়ে এসে রিফাত হোসাইনকে ঘেরাও করেন।
এ সময় কার্যালয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে দাবি করা হয়। পরে বিআরটিএর কর্মকর্তারা অফিসকক্ষের ভেতরে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে এবং ওই সময় যশোর বিআরটিএতে কর্মরত একজন স্টাফ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পরবর্তীতে রিফাত হোসাইনকে যশোর থেকে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়। স্থানীয়ভাবে কেউ কেউ এটিকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে দাবি করলেও বিষয়টি অস্বীকার করে যশোর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ জমির হোসেন বলেন, অফিসিয়াল নিয়ম মেনে এবং দাপ্তরিক প্রয়োজনেই তাকে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে রিফাত হোসাইন কুষ্টিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ে কর্মরত থাকলেও তার বেতন যশোর বিআরটিএ থেকে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দাপ্তরিক নিয়ম মেনেই তাকে কুষ্টিয়ায় দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় নতুন করে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মুহাম্মদ অহিদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লিখিত অভিযোগ না থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও জানান তিনি। একপর্যায়ে রিফাত হোসাইনের আচরণ প্রসঙ্গে তার পক্ষেও বক্তব্য দেন সহকারী পরিচালক।
তবে অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি দেখবেন। একইসঙ্গে রিফাত হোসাইনকে সংশোধনের একটি সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। ভবিষ্যতে তার আচরণ বা কার্যক্রমে পরিবর্তন না এলে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ করার কথাও জানান।
এদিকে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ, হয়রানি কিংবা দালালনির্ভরতার অভিযোগ উঠলে শুধু লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, একজন নাগরিক সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও যদি অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপে পড়েন, তাহলে তা সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
ফিটনেস ও নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের মতো সেবা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সেবা পেতে নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় কিংবা দালালের ওপর নির্ভর করতে হয় বলে অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।
তাদের দাবি, যশোরে রিফাত হোসাইনকে ঘিরে অতীতের অভিযোগ এবং বর্তমানে কুষ্টিয়া বিআরটিএতে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা দালালের সহায়তা ছাড়াই সরাসরি সরকারি সেবা নিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া বিআরটিএর সহকারী মোটরযান পরিদর্শক রিফাত হোসাইন বলেন, এসব অভিযোগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।