বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শেষ মুহূর্ত ও শেষ শ্বাস পর্যন্ত লড়ে যেতে চান তিনি। এ পথে কোনো ধরনের আপস করবেন না এবং আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথা নত করবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াত আয়োজিত মাসব্যাপী গণসংযোগ উপলক্ষে দাওয়াতি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশকে আমরা ভালোবাসি। এ দেশের জন্য আল্লাহ যেন শেষ মুহূর্ত ও শেষ শ্বাস পর্যন্ত মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ে যাওয়ার তৌফিক দান করেন। কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। কোনো বাতিলের সঙ্গে আপস হবে না। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথা নত করব না।’
নিজের জীবন ও মৃত্যুকে মহান আল্লাহর হাতে অর্পিত আমানত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহর দেওয়া জীবন তার কাছে আমানত। সেই আমানত আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত।
তিনি বলেন, চলার পথে বাধা, সমালোচনা ও গালিগালাজ আসতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে জীবন দিতে হতে পারে কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারাতে হতে পারে। এসবকেও আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে গ্রহণ করে তা তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানান তিনি।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ এ দেশ মুক্ত হবে। ইনশাআল্লাহ এ দেশে কোরআনের আইন কায়েম হবে।’
তবে কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হলেও আপনি-আমি যদি এর সঙ্গী হতে না পারি, তাহলে সেটি সৌভাগ্যের বিষয় হবে কি না, তা ভাবতে হবে। এ সৌভাগ্য অর্জনের জন্য তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
কওমি শিক্ষার খেদমতকে ছোট করে দেখি না
কওমি শিক্ষাব্যবস্থার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কওমির দ্বীনি খেদমতকে তারা ছোট করে দেখেন না। কওমি থেকে কেউ জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হলেও তিনি কওমির সঙ্গেও থাকবেন এবং জামায়াতের সঙ্গেও থাকবেন—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কওমিকে তারা আলাদা করে দেখেন না।
তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের দ্বীনি খেদমতকে ছোট মনে করি না। তাদের জন্য অন্তর থেকে দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদের খেদমতে আরও বেশি বরকত দান করেন।’
সংসদে কওমি সংশ্লিষ্টদের অধিকার নিয়ে কথা বলাকে নিজেদের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অবস্থান কোনো ব্যক্তি বা সমাজের একটি অংশকে খুশি করার জন্য নয়; বরং বিবেক ও দায়বোধ থেকেই নেওয়া হয়েছে।
নিজেকে নিয়ে সমালোচনা, গালিগালাজ ও অপমানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুখের কষ্টের দাগ কখনো যায় না।’ এসব ঘটনায় তিনি আত্মতৃপ্তি পান বলেও মন্তব্য করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শ্রেষ্ঠ মানুষকেও সমাজের অবুঝ মানুষের নানা আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি মূলত অন্যদের ক্ষমা করেন নিজের জন্য ক্ষমা পাওয়ার আশায়। মহান আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটির ক্ষমা পাওয়ার প্রত্যাশা থেকেই তিনি অন্যদের ক্ষমা করেন বলে জানান।
যুব সমাজের প্রতি আহ্বান
যুব সমাজের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, যৌবন মহান আল্লাহর বড় নিয়ামত। দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে সব যুগেই যুবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, বয়স বেড়ে যাওয়া মানেই তারুণ্য শেষ হয়ে যাওয়া নয়। মনের মধ্যে যৌবনের আকাঙ্ক্ষা, উদ্যম ও চঞ্চলতা ধরে রাখাই প্রকৃত তারুণ্য। আল্লাহ যতদিন হায়াত দেবেন, ততদিন তারুণ্যের শক্তি ও উদ্যম নিয়ে কাজ করে যাওয়ার জন্য তিনি দোয়া করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বড় প্রত্যাশা ও বুকভরা আশা নিয়ে তারা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ, মানবতা, দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু করা এবং নিজেদের আখেরাত সুন্দর করার লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছেন। বাকি জীবন মহান আল্লাহ ও মানবতার জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করে সমাজকে অশান্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি ইসলামের শিক্ষা এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করবেন।
এর আগে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ড. এএসএম খালিকুজ্জামান। তিনি বলেন, সমাজ পরিচালনা ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভালো মানুষের রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমাজের ভালো মানুষগুলো রাজনীতিতে না এলে সেই জায়গা খারাপ লোকজন দখল করবে। খারাপ লোকজন দেশের দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইসলামভিত্তিক একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ও সোনালি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর মাধ্যমে দুনিয়ায় শান্তি এবং আখেরাতে মুক্তি লাভের লক্ষ্যেই মানুষকে আল্লাহ, সত্য ও সুন্দরের দিকে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
নতুন যারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাদের স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রমে পর্যায়ক্রমে তাদের এগিয়ে আসতে হবে।