দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন ইউনিট পুনর্গঠনের পর নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এরই মধ্যে সংগঠনের প্রায় সব ইউনিটের পুনর্গঠন শেষ হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকাও অনেকটাই ছোট করে আনা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের যাচাই-বাছাই শেষ হলেই যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। শুরুতে পাঁচ সদস্যের নেতৃত্ব ঘোষণা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়া তদারক করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিদায়ী নেতৃত্বের সঙ্গে এ সাক্ষাতের পাশাপাশি নতুন কমিটিতে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়েও তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। বর্তমান নেতাদের কাছে সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর নামও জানতে চাওয়া হয়েছে। এসব নামসহ অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের বেশির ভাগকেই বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। ফলে অতীতের মতো কয়েকজন নেতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কথিত ‘সিন্ডিকেটের’ প্রভাব এবার তুলনামূলক কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তিত পরিস্থিতি, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনা করেই নতুন নেতৃত্ব বাছাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হতে যাচ্ছে।
বর্তমান কমিটির অনেক নেতা অতীতের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগও করেছেন। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে সে সময় রাজপথে সক্রিয় থেকে আলোচনায় আসেন। ফলে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবার নেতৃত্ব নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শীর্ষ নেতৃত্বে আলোচনায় একাধিক নাম
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, নতুন কমিটিতে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা বেশি। শীর্ষ পদগুলোর জন্য আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুবারের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, সহসভাপতি মনজুরুল আলম
রিয়াদ, সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরসেদ আলম সোহেল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল, মোমিনুল ইসলাম জিসান, রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, সালেহ মো. আদনান, সাহিত্য ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান।
এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র সাহস, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ মাসুম এবং সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নামও আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে একাধিক মামলার আসামি হন এবং কয়েক দফা গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন। রাজপথের সক্রিয় ও নির্যাতিত ছাত্রনেতা হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। তার দাবি, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর তার নেতৃত্বে রাজধানীতে ৪০টির বেশি মিছিল হয়েছে।
মনজুরুল আলম রিয়াদ এর আগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও অমর একুশে হলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন সময়ে তিনি কারাভোগ করেছেন।
খোরসেদ আলম সোহেলও একাধিক মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। আন্দোলনের সময় রিমান্ডে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পল্টন থানার একটি মামলার আসামি ছিলেন সালেহ মো. আদনান। তিনিও রাজপথের সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিলের নামও নতুন নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার পাশাপাশি তিনি তৃণমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিলে অধ্যয়নরত।
ঢাবির বাইরের নেতারাও আলোচনায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও কয়েকজন নেতার নাম নতুন কমিটির সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।
ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসাসেবায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সক্রিয় ছিলেন।
কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের বিরুদ্ধে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে একাধিক মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে তিনি গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৫ সালের অবরোধের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর একটি ভবনে আশ্রয় নিলে সেখান থেকেও তাকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। গত কয়েকটি কমিটিতে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারাই স্থান পেয়েছেন।
এতে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস থেকে নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ সীমিত হচ্ছে বলে মনে করেন সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী।
তাদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাদেরও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার মতে, ছাত্রদলের ১১৮টি ইউনিটের মধ্যে নেতৃত্বে ভারসাম্য আনতে শীর্ষ পাঁচ পদের অন্তত দুই থেকে তিনটি পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের নেতাদের দেওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন মিললেই যেকোনো সময় প্রথম ধাপে পাঁচ সদস্যের নেতৃত্ব ঘোষণা হতে পারে।