সাইফুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:
এক হাতে জাল, অন্য হাতে কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম। সকাল হলেই ছুটতে হয় নদীর দিকে। কখন জোয়ার আসবে, কখন ভাটা নামবে—সেই হিসাব করেই কাটে দিন। নদীতে কাঁকড়া বা রেণুপোনা মিললে তা বিক্রি করে পরিবারের হাতে তুলে দিতে হয় টাকা। কারণ ঘরে খাবার নেই, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ আছে। বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার চেয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই তাদের কাছে বড় দায়িত্ব।
এভাবেই শৈশব পার করছে খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার অনেক শিশু।
কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব শিশুর জীবনে দারিদ্র্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সংকট। কোনো পরিবার ঘর হারাচ্ছে, কোনো পরিবারের জীবিকা নষ্ট হচ্ছে, আবার কোনো পরিবার দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতায় আটকে পড়ছে। সংকটের চাপে শিশুদেরও নামতে হচ্ছে জীবিকার কাজে।
ফলে যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সেই বয়সেই কারও হাতে উঠছে জাল, কারও হাতে কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম। কেউ আবার নদী ও খাল থেকে রেণুপোনা সংগ্রহে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে স্কুলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে তাদের।
গোবরা গ্রামের দুই ভাই যুবায়ের হোসেন ও সুমন হোসেনের গল্পটি এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। দুজনই পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কিন্তু পরিবারের অভাব তাদের শৈশবকে অন্য পথে ঠেলে দিয়েছে।
তাদের বাবা অন্যত্র সংসার করায় অসুস্থ মায়ের সঙ্গে কষ্টে দিন কাটছে দুই ভাইয়ের। সংসারের খরচ ও মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে তারা নদীতে কাঁকড়া ধরে। প্রতিদিন শতাধিক কাঁকড়া সংগ্রহ করে অল্প দামে বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়েই চলে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ।বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও জীবিকার তাগিদে নদীতে যেতে হচ্ছে তাদের।
একই এলাকার হাসান ও হোসেন দুই ভাইয়ের জীবনও প্রায় একই। বাবাকে হারানোর পর অসুস্থ মায়ের ভরসায় বড় হতে হচ্ছে তাদের। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছে অল্প বয়সেই। পড়াশোনা ছেড়ে তাদের এখন জীবিকার চিন্তা করতে হচ্ছে তাদের ভাষায়, ‘ঠিকমতো তিনবেলা খা
বারই জোটে না, স্কুলে যাব কীভাবে?’
উপকূলের বাঘ বিধবাদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আইসিডির সভাপতি আশিকুজ্জামান আশিক বলেন, দারিদ্র্য, দুর্যোগ ও জীবিকার সংকটে উপকূলের অনেক শিশু পড়াশোনা ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে। এসব শিশুকে শিক্ষায় ধরে রাখতে পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কয়রার উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে নদী ও সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িত। কেউ নদীতে মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া আহরণ করেন, কেউ সুন্দরবনে গিয়ে মাছ, মধু বা গোলপাতা সংগ্রহ করেন। এসব পরিবারের আয় অনেকটাই অনিশ্চিত।
জোয়ারের পানি বাড়লে নদীর চরিত্র বদলে যায়, ভাটায় আবার দৃশ্যপট পাল্টে যায়। এই জোয়ার-ভাটার সঙ্গে পরিচিত হয় শিশুরাও ছোটবেলা থেকেই।
অনেক শিশুর কাছে দিনের হিসাব হয়—কখন নদীতে যেতে হবে, কখন জাল ফেলতে হবে, কখন কাঁকড়া পাওয়া যাবে, কখন তা বাজারে বিক্রি হবে।
শিশুদের কাছে স্কুলের ঘণ্টার চেয়ে নদীর জোয়ারের সময় কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ নদী থেকে পাওয়া সামান্য আয়ই পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করে।
উপকূলের মানুষের জন্য ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস শুধু একটি দুর্যোগ নয়; এটি অনেক পরিবারের জন্য আবার নতুন করে শুরু করার লড়াই।
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকলে ফসলি জমি, মাছের ঘের ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙনে কেউ হারান বসতভিটা। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর।
পরিবারের আয় কমে গেলে প্রথমে কমে যায় শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ। অনেক শিশু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে পরিবারের কাজে যুক্ত হয়। কেউ কেউ স্থায়ীভাবেই শিক্ষার বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে দুর্যোগের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার এই সম্পর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় শিক্ষা ব্যাহত হলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উপকূলের শিশুদের আরেক বড় সংকট নিরাপদ পানি। লবণাক্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় সুপেয় পানির উৎস সংকুচিত হয়। দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে শিশুদেরও পরিবারের সঙ্গে পানি সংগ্রহে যেতে হয়।
দীর্ঘদিন লবণাক্ত ও জলাবদ্ধ পরিবেশে বসবাস, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। অসুস্থতার কারণে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে; আবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারকে আরও বেশি আয় করতে হয়। তৈরি হয় একটি দুষ্টচক্র—দারিদ্র্য থেকে শিশুশ্রম, শিশুশ্রম থেকে শিক্ষাঝরে পড়া, আর শিক্ষাঝরে পড়া থেকে ভবিষ্যতের দারিদ্র্য।
অভাবের সঙ্গে দুর্যোগ যুক্ত হলে মেয়েশিশুরাও ভিন্ন ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। পরিবারের আর্থিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপের কারণে কোথাও কোথাও অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
একবার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে মেয়েদের শিক্ষায় ফেরার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়। দরিদ্র পরিবারের আয়, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগের সময় শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং শিশুশ্রম বন্ধ—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে উপকূলের অনেক শিশু শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং শিশুদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এই পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। নদী ও সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থান এবং শিশুদের শিক্ষায় ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দরকার।
শিশুদের স্কুলে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট দূর করা না গেলে সেই উদ্যোগ টেকসই হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়রার মতো উপকূলীয় এলাকায় তাই শিশুদের জন্য আলাদা করে দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা অবকাঠামো, দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি জরুরি।
একই সঙ্গে নদী ও সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ শিশুর হাতে জাল তুলে দিয়ে হয়তো একটি দিনের খাবার জোগাড় করা যায়, কিন্তু কেড়ে নেওয়া হয় তার ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ।
কয়রার নদীর পাড়ে এখনো সকাল হলে দেখা যায় ছোট ছোট শিশুকে জীবিকার সন্ধানে ছুটতে। কারও হাতে জাল, কারও হাতে কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম। নদীর পানিতে নেমে তারা খুঁজে ফেরে দিনের আয়।
অথচ এই বয়সেই তাদের স্কুলে থাকার কথা। শ্রেণিকক্ষে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী—এমন স্বপ্ন দেখার অধিকার তাদেরও আছে।কিন্তু পেটের ক্ষুধা যখন বইয়ের পাতাকে হার মানায়, তখন স্বপ্নও হারিয়ে যায় বাস্তবতার কাছে।উপকূলের এই শিশুদের গল্প তাই শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ, বৈষম্য, শিশুশ্রম ও শিক্ষাবঞ্চনার সম্মিলিত গল্প।
কয়রার নদীগুলো প্রতিদিন জোয়ারে ফুলে ওঠে, ভাটায় আবার নেমে যায়। কিন্তু এসব শিশুর জীবনে দারিদ্র্যের জোয়ার কখন নামবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যে শিশুর হাতে আজ কাঁকড়া ধরার ঝুড়ি, তার হাতেই কি কাল বই-খাতা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে? উত্তরটি নির্ভর করছে রাষ্ট্র, সমাজ ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর।