রাজনীতিতে হানাহানি ও সংঘর্ষ এড়িয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সহিষ্ণুতা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়। আসুন, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করি।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার দুপুরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছালে উপস্থিত জনতা করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানায়। এ সময় দুই হাত তুলে জনতার অভিবাদনের জবাব দেন রাষ্ট্রপতি।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগমও উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন পর নিজ এলাকায় তার আগমন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের সঞ্চালনায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা ও বাইবেল পাঠের মাধ্যমে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে রাষ্ট্রপতির জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘শিকড় থেকে শিখরে’ প্রদর্শন করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
ঠাকুরগাঁওবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। এই ঋণ শোধ করার নয়।’
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বরাবরই পিছিয়ে পড়া। এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র এবং অনেকেই নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার কথা ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন না। তবে মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা তিনি সবসময় করেছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি যখনই আপনাদের কাছে এসেছি, আপনারা আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমি চেষ্টা করেছি সেই আস্থার মূল্য দিতে। আমরা আর রক্তপাত চাই না।’
ঠাকুরগাঁওকে শান্তিপূর্ণ এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার মানুষ ঝামেলা পছন্দ করেন না। এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।
সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, নিজেদের মতবাদ প্রচার করবেন; কিন্তু সংঘাতে জড়াবেন না। আমরা আর রক্তপাত চাই না।’
রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস সহিষ্ণুতা। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ থাকবে—কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়। আসুন, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে এসে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয় ছিল। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জমি হয়ে গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমাদের সামনে বসে আছেন। মেডিক্যাল কলেজের কথা বলেছিলেন, সেটাও হয়েছে।’
ভুল্লি ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবি বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিমানবন্দর কার্যকরভাবে চালু করতে হলে এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতেও কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা আমাকে ধাক্কা মেরে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগটা কমে গেল।’
তবে ঠাকুরগাঁওবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা কেউ ভাববেন না যে আমি আপনাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি বা আপনারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আপনাদের সঙ্গেই থাকব।’
বক্তব্যের শেষ দিকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা যেন আমাকে সেই তৌফিক দেন, জীবনের বিনিময় হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি। দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য কাজ করতে পারি।’
অনুষ্ঠানে ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুস সালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান, জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।