বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

ইসলাম ও জীবন

যে সময়ের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়

স্বপ্ন মানুষের অবচেতন মনের এক গভীর প্রকাশ, যা অনেক সময় আমাদের কৌতূহল সৃষ্টি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্নের তাৎপর্য রয়েছে এবং মুমিনদের স্বপ্ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহানবী সা. বলেছেন, মুমিনের স্বপ্ন সত্য হতে পারে, তবে কিছু স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকেও হতে পারে। তাই, স্বপ্নের মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা জানবো কার স্বপ্ন বেশি […]

নিউজ ডেস্ক

১২ জানুয়ারী ২০২৫, ১৪:৪৯

স্বপ্ন মানুষের অবচেতন মনের এক গভীর প্রকাশ, যা অনেক সময় আমাদের কৌতূহল সৃষ্টি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্নের তাৎপর্য রয়েছে এবং মুমিনদের স্বপ্ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহানবী সা. বলেছেন, মুমিনের স্বপ্ন সত্য হতে পারে, তবে কিছু স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকেও হতে পারে। তাই, স্বপ্নের মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা জানবো কার স্বপ্ন বেশি সত্য হয় এবং কোন সময়ের স্বপ্ন সত্য হয়, ইনশাআল্লাহ।

স্বপ্ন তাৎপর্যহীন নয়
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের স্বপ্ন তাৎপর্যহীন নয়, বরং মুমিনের স্বপ্ন বিশেষ গুরুত্ব রাখে। রসুলুল্লাহ সা. সত্য স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ বলেছেন। আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, কেবল মুবাশশিরাত (সুসংবাদ) ছাড়া নবুয়তের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সাহাবিরা প্রশ্ন করেন, মুবাশশিরাত কী? তিনি বলেন, ভালো স্বপ্ন। (বুখারি শরিফ, হাদিস: ৬৯৯০) অন্য হাদিসে বিশ্বনবী সা. বলেন, মুমিনের স্বপ্ন নবুওতের ৪৬ ভাগের এক ভাগের সমান। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস: ৫০১৮)

যাদের স্বপ্ন সত্য হয়
নবী-রাসুলদের স্বপ্ন ছিল সন্দেহাতীতভাবে সত্য। তাঁদের স্বপ্ন ছিল ওহি। সহিহ বুখারির বর্ণনা মতে, নবীজির ওপর স্বপ্ন সত্যের মাধ্যমেই তাঁর ওপর ওহি নাজিলের সূচনা হয়েছিল। আর উম্মতের মধ্যে তাদের স্বপ্নই বেশি সত্য হয়, যারা কথা ও কাজে অধিক সত্যবাদী। নবী করিম সা. বলেছেন, সময় যখন কাছাকাছি হবে তখন মুসলিমের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না এবং যে যত সত্যবাদী হবে তার স্বপ্নও তত সত্য হবে। স্বপ্ন তিন প্রকার: ১. উত্তম স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, ২. ভীতিপ্রদ স্বপ্ন, যা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, ৩. যা মানুষ চিন্তা-ভাবনা ও ধারণা অনুপাতে দেখে থাকে। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস: ৫০১৯)

যে সময়ের স্বপ্ন সত্য হয়
দিন ও রাতের যেকোনো সময়ের স্বপ্ন সত্য হতে পারে। কোনো সময়কে সত্য স্বপ্নের জন্য নির্ধারণ করা হয়নি। তবে রাতের স্বপ্ন দিনের স্বপ্নের তুলনায় অধিক শক্তিশালী। আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে সিরিন রহ. বলেছেন, দিনের স্বপ্ন রাতের স্বপ্নের মতো হয়। ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে উভয়ের বিধান এক। পুরুষ ও নারীর স্বপ্নের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। (তাফসিরুল আহলাম মিন কালামি আইম্মাতিল আলাম, পৃষ্ঠা-৯৩)

তবে মহানবী সা. এমন কিছু সময় উল্লেখ করেছেন, যেসব সময়ের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়।

১. যখন দিন-রাতের পরিধি সমান হয়: যখন দিন ও রাতের ব্যাপ্তি সময় বা কাছাকাছি হয়, তখন মুমিনের স্বপ্ন সত্য হয়। রসুলুল্লাহ সা. বলেন, সময় যখন কাছাকাছি হবে তখন মুসলিমের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস: ৫০১৯) ইমাম বাগাভি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, বসন্ত ও শরৎকালের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়। যখন গাছে ফল আসে ও তা পরিপক্ব হয়, তখন সময় নিকটবর্তী থাকে এবং দিন-রাতের পরিধি সমান থাকে। (তাজিলুস সুকয়া ফি তাবিরির রুয়া, পৃষ্ঠা-১৩)

২. শেষ রাতের স্বপ্ন: প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, রাতের শেষ অর্ধাংশের স্বপ্ন বেশি সত্য হয়, চাই তা ফজরের আগে হোক বা পরে। কেননা এ সময় মহান আল্লাহ পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন এবং এটা ফেরেশতাদের ছড়িয়ে পড়ার সময়। আর প্রথম অর্ধাংশের স্বপ্ন বেশির ভাগ সময় মিথ্যা হয়, কেননা এটি শয়তানের বিচরণ করার সময়। (তাজিলুস সুকয়া ফি তাবিরির রুয়া, পৃষ্ঠা-১৩) এ বিষয়ে বিশ্বনবী সা. বলেছেন, শেষ রাতের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ২২৭৪)

৩. কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়: কিয়ামতের পূর্বে মুমিনের স্বপ্ন অধিক পরিমাণে সত্য হবে। মহানবী সা. বলেছেন, যখন কিয়ামতের সময় নিকটবর্তী হবে, তখন মুমিনের স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ২২৭০) এর কারণ ব্যাখ্যায় আল্লামা সিন্ধি রহ. বলেন, কিয়ামত হলো সেই সত্য প্রকাশকারী, যা সব সত্য প্রমাণ করবে। সুতরাং যে জিনিস তার যত বেশি নিকটবর্তী হবে তা তত বেশি বাস্তব হবে। (মুসনাদে আহমদ (টীকা): ১৩/৮২)

যে সময়ের স্বপ্ন দ্রুত প্রতিফলিত হয়
আল্লামা দিনওয়ারি রহ. বলেন, প্রথম রাতের স্বপ্ন বিলম্বে বাস্তবায়িত হয়, রাতের অন্য অংশের তুলনায় শেষ অর্ধাংশের স্বপ্ন দ্রুত প্রতিফলিত হয়। সবচেয়ে দ্রুত প্রতিফলিত হয় সাহরির (শেষ রাত) সময়ের স্বপ্ন, বিশেষ করে ফজর উদিত হওয়ার সময়। (ফাতহুল বারি: ১৬/৩৩৯)

স্বপ্নের ব্যাপারে মহানবী সা.-এর হুঁশিয়ারি
আবু রাজিন উকাইলি রা. বলেন, রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, স্বপ্নের ব্যাপারে যে পর্যন্ত আলোচনা করা না হয়, সে পর্যন্ত এটা পাখির পায়ে (ঝুলে) থাকা জিনিসের মতো। আলোচনা করার সঙ্গে সঙ্গে তা যেন পা থেকে পড়ে গেল। তাই স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি যেন জ্ঞানী ব্যক্তি অথবা পছন্দীয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো কাছে স্বপ্নের ব্যাপারে আলোচনা না করে।(তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ২২৭৮)

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে স্বপ্নের তাৎপর্য বুঝে, তা সঠিকভাবে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করা এবং ভালো স্বপ্নে  আল্লাহর প্রশংসা করা ও খারাপ স্বপ্নে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ইসলাম ও জীবন

সৌদিতে চাঁদ দেখা গেছে, কাল থেকে রোজা শুরু

সৌদি আরবে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সরকার পবিত্র রমজান মাস শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, চাঁদের দেখা মেলায় কাল বুধবার প্রথম রোজা হবে। ‘হারামাইন’ নামে ওয়েবসাইট থেকে বলা হয়েছে, “সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ধচন্দ্রের দেখা মিলেছে। ফলে আজ রাত থেকে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজান মাস শুরু।” “তারা […]

সৌদিতে চাঁদ দেখা গেছে, কাল থেকে রোজা শুরু

ছবি সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৮

সৌদি আরবে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সরকার পবিত্র রমজান মাস শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, চাঁদের দেখা মেলায় কাল বুধবার প্রথম রোজা হবে।

‘হারামাইন’ নামে ওয়েবসাইট থেকে বলা হয়েছে, “সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ধচন্দ্রের দেখা মিলেছে। ফলে আজ রাত থেকে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজান মাস শুরু।”

“তারা আরও বলেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সিয়াম, কিয়াম এবং ইবাদত কবুল করুক। এবং তিনি যেন আমাদের এই বরকতময় মাসের মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যয় করার তাওফিক দান করেন। আমীন।”

ইসলাম ও জীবন

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারির পর এবার বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। স্থানীয় সময় রোববার (৫ এপ্রিল) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হিটলারের প্রশংসা, ইহুদিবিদ্বেষী ও উগ্রবাদী প্রচারণার অভিযোগে আজহারিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পরেই অস্ট্রেলিয়া সরকার শায়খ আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা […]

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

এবার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া

নিউজ ডেস্ক

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৯

জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা মাওলানা ড. মিজানুর রহমান আজহারির পর এবার বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। স্থানীয় সময় রোববার (৫ এপ্রিল) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

হিটলারের প্রশংসা, ইহুদিবিদ্বেষী ও উগ্রবাদী প্রচারণার অভিযোগে আজহারিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পরেই অস্ট্রেলিয়া সরকার শায়খ আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নিলো।

খবরে জানা গেছে, সিডনি বিমানবন্দর দিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তার ভিসা বাতিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ম্যাট থিসলেথওয়েট এই সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইহুদিবিদ্বেষী বা ইসলামোফোবিক বক্তব্যকারীদের প্রতি অস্টেলিয়া সরকারের কোনো সহনশীলতা নেই।

এ ছাড়া ডেইলি টেলিগ্রাফ শায়খ আহমদুল্লাহর ভিসা বাতিলের খবর নিয়ে প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, শায়খ আহমদুল্লাহ অতীতে ইহুদিদের ঘৃণ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার জন্য ইহুদিদের দায়ী করেন।

(আইপিডিসি)-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে শায়খ আহমদুল্লাহ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরে যান। সফরের অংশ হিসেবে তিনি প্রথমে মেলবোর্নে পৌঁছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা দেন।

মিজানুর রহমান আজহারির ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া মিজানুর রহমান আজহারির ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া
তার ৩ এপ্রিল মেলবোর্নের আল-তাকওয়া কলেজ, ৪ এপ্রিল সিডনির ডায়মন্ড ভেন্যুতে প্রধান কনভেনশন, ৬ এপ্রিল ক্যানবেরার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার, ১০ এপ্রিল অ্যাডিলেডের উডভিল টাউন হল এবং ১১ এপ্রিল পার্থে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল।

তবে এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার আগেই আজহারির মতো তাকেও অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হলো।

ইসলাম ও জীবন

ঐতিহাসিক বদর দিবস আজ, ইসলামের প্রথম বিজয়

রমজানের নীরব আকাশের নিচে ইতিহাসের কিছু দিন এমন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত অধ্যায়। মুসলিম ইতিহাসে তেমনই এক দিন বদর দিবস। মরুপ্রান্তরের এক অনাড়ম্বর ভূমিতে সংঘটিত সেই ঘটনাটি কেবল একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি ঈমানের দৃঢ়তা, নৈতিক সাহস এবং আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার এক অনন্য দলিল। হিজরি দ্বিতীয় […]

নিউজ ডেস্ক

০৭ মার্চ ২০২৬, ১৩:২২

রমজানের নীরব আকাশের নিচে ইতিহাসের কিছু দিন এমন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত অধ্যায়।

মুসলিম ইতিহাসে তেমনই এক দিন বদর দিবস। মরুপ্রান্তরের এক অনাড়ম্বর ভূমিতে সংঘটিত সেই ঘটনাটি কেবল একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি ঈমানের দৃঢ়তা, নৈতিক সাহস এবং আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার এক অনন্য দলিল।

হিজরি দ্বিতীয় সনের ১৭ রমজান। আরবের উত্তপ্ত বালুকাময় ভূমিতে মদিনা থেকে অগ্রসর হচ্ছিলেন নবী করিম সা. এবং তার অল্পসংখ্যক সাহাবি। তাদের সংখ্যা মাত্র তিন শতাধিক ইতিহাসে যাদের পরিচয় বদরী সাহাবি নামে অমর হয়ে আছে।

অপরদিকে মক্কার কুরাইশরা এসেছিল প্রায় এক হাজার যোদ্ধার সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে। অস্ত্র, অশ্বারোহী শক্তি এবং সামরিক প্রস্তুতিতে তারা ছিল বহুগুণ শক্তিশালী। কিন্তু সেই অসম বাস্তবতার মাঝেও মুসলমানদের হৃদয়ে ছিল এক অদৃশ্য শক্তি ঈমানের দীপ্তি এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা।

মদিনা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রান্তর এ এসে মুখোমুখি দাঁড়ায় দুই শক্তি একদিকে অহংকার ও ক্ষমতার প্রাচুর্য, অন্যদিকে সত্য ও বিশ্বাসের অটল প্রত্যয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটিকে বলা হয়েছে ইয়াওমুল ফুরকান সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের দিন।

যুদ্ধের প্রাক্কালে নবী মুহাম্মদ সা. গভীর আকুতিতে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন। ইতিহাসের বর্ণনায় আছে, তিনি দু’হাত উঁচু করে প্রার্থনা করেছিলেন যদি এই ক্ষুদ্র দলটি আজ পরাজিত হয়, তবে পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতকারী আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সেই মুহূর্তে তার দোয়ার আবেগ, সাহাবিদের অটল আস্থা এবং মরুর নিস্তব্ধতার ভেতর এক আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, যা মুসলিম চেতনার ইতিহাসে এক অনন্য দৃশ্য হয়ে আছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আল্লাহ তো বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছিলেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল।”

এই আয়াত শুধু একটি বিজয়ের স্মৃতি নয়, এটি মুসলিম সভ্যতার এক গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরে মানবিক শক্তির সীমাবদ্ধতার ওপরে আছে ঈমানের শক্তি এবং আল্লাহর সাহায্য। ইসলামী ঐতিহ্যে বলা হয়, সেই যুদ্ধে ফেরেশতাদের সহায়তা নেমে এসেছিল, যা বদরের বিজয়কে কেবল সামরিক সাফল্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক জয়ের প্রতীক করে তুলেছে।

বদরের বিজয় মুসলিম সমাজের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। মক্কায় দীর্ঘ নির্যাতন ও বঞ্চনার ইতিহাস পেরিয়ে মদিনায় নবগঠিত মুসলিম সমাজ তখনো ছিল নাজুক অবস্থায়। কিন্তু এই বিজয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আরবের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলমানদের উপস্থিতি তখন আর উপেক্ষা করার মতো ছিল না। বদরের মরুপ্রান্তরেই যেন ইতিহাস প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছিল একটি নতুন সভ্যতার সূচনা হয়েছে।

তবে বদরের প্রকৃত মাহাত্ম্য কেবল বিজয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধশেষে নবী করিম সা. বন্দিদের প্রতি যে মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

অনেক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল শিক্ষাদানের বিনিময়ে যা প্রমাণ করে, ইসলামের নৈতিকতা যুদ্ধের উত্তেজনাকেও অতিক্রম করে মানবতার মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়।

আজও রমজানের দিনগুলো যখন ফিরে আসে, মুসলিম হৃদয়ে বদর দিবস নতুন করে জেগে ওঠে। এটি কেবল অতীতের একটি যুদ্ধকে স্মরণ করা নয়, বরং একটি আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা যেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা একত্রে ইতিহাস রচনা করে।

বদরের মরুপ্রান্তরে যে আলোকরেখা উদিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে সমগ্র আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে বিশ্বসভ্যতার দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলো আজও মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় সংখ্যা নয়, সম্পদ নয়, বরং ঈমান, আদর্শ এবং নৈতিক দৃঢ়তাই ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের প্রকৃত শক্তি।

বদর তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়, এটি মুসলিম চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক যেখানে মরুর নীরবতার মধ্যেই প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয়েছিল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর