কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগীর ছদ্মবেশে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সুরাইয়া সুলতানার নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম আকস্মিকভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের হয়রানি, অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সেবা প্রদানসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করতে পূর্বঘোষণা ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের গোপনীয়তা বজায় রাখতে টিমের সদস্যদেরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের গন্তব্য সম্পর্কে জানানো হয়নি।
প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী অভিযানের শুরুতেই দুদকের দুই সদস্য সাধারণ রোগীর ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ান। তারা টিকিট সংগ্রহ, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিভিন্ন সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় নিয়ম ও সিরিয়াল অনুসরণ না করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দ্রুত সেবা বা সিরিয়াল পাওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেন তারা।
পরে দুদকের পুরো টিম হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইউনিট পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ছিল ব্লাড ব্যাংক, জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার (ওটি), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) এবং হাসপাতালের রান্নাঘর। এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক নথিপত্রও যাচাই-বাছাই করা হয়।
অভিযান চলাকালে সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলেন দুদক কর্মকর্তারা। তাদের কাছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, খাবার সরবরাহ এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এ সময় রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ও অসন্তোষের কথা শোনা যায় বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সুরাইয়া সুলতানা। তিনি জানান, অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে বেশ কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গুরুতর একটি অভিযোগ হলো অর্থের বিনিময়ে মৃত্যুসনদ দেওয়ার বিষয়টি।
এ ছাড়া নার্সদের রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম এবং প্যাথলজিক্যাল সেবায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ও তথ্যও অভিযানে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
সুরাইয়া সুলতানা বলেন, অভিযানে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে কমিশন বরাবর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠানো হবে। এরপর কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের এই আকস্মিক অভিযান সম্পর্কে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দুদক হঠাৎ করেই হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে অভিযান শেষে এখন পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত তথ্য-উপাত্ত বা প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। লিখিত অভিযোগ বা প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের নানা ভোগান্তি ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে দুদকের এই আকস্মিক অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রোগীর ছদ্মবেশে সরাসরি সেবাগ্রহণের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ইউনিট পরিদর্শনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর থাকবে।