মা নেই, বাবাও নেই। শূন্য ঘরে নেই অভিভাবকের ছায়া। কে দেখবে, কে আগলে রাখবে—সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় হয়েছে দুই ভাই অর্ণব ও অরিত্র সরকার। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে সেই ঘরেই এবার জ্বলেছে সাফল্যের আলো। বড় ভাই অর্ণবের যত্ন আর নিজের অদম্য চেষ্টায় এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) পেয়েছেন ছোট ভাই অরিত্র সরকার।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বাগেরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এই সাফল্য অর্জন করেন ১৬ বছর বয়সী অরিত্র।
সোমবার সকালে মোবাইল ফোনে ফলাফল দেখার পর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কথা ছিল দুই ভাইয়ের। কিন্তু তাদের আনন্দের সঙ্গী হওয়ার মতো বাবা-মা কেউ নেই। বাবা-মা থাকলে হয়তো ঘরে বসত মিষ্টির আয়োজন, স্বজন-প্রতিবেশীদের নিয়ে হতো আনন্দ-উৎসব। কিন্তু সাফল্যের এই দিনটিও তাদের কেটেছে অনেকটা নীরবে।
ফল প্রকাশের পর অরিত্র ও তার ১৯ বছর বয়সী বড় ভাই অর্ণব সারাদিন ঘরেই ছিলেন। ছোট ভাইয়ের সাফল্যে আনন্দিত হলেও বাবা-মাকে হারানোর বেদনা যেন সেই আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
অরিত্রের বাবা উৎপল সরকার জানাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি মুদি দোকান চালাতেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের কাঁধে এসে পড়ে সংসারের ভার। বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি কিছুদিন চালানোর চেষ্টা করলেও আর্থিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকেই টিউশনি করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আসছেন অর্ণব ও অরিত্র। তাদের দেখাশোনার জন্য পাশে রয়েছেন এক খালা (মাসি)। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি দুই ভাইয়ের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন।
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর প্রিয় শিক্ষক ও সহপাঠীদের মোবাইল ফোনে কৃতজ্ঞতা জানান অরিত্র। তার এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং সহপাঠীদের উৎসাহের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
অরিত্রের স্বপ্ন ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হয়ে মানুষের সেবা করা। অন্যদিকে বড় ভাই অর্ণবের স্বপ্ন আইনজীবী হয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুজনের চোখেই বড় স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট।
অর্ণবও ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এখন নিজের ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন তিনি। ছোট ভাইয়ের গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নিজের ফলাফল নিয়েও আশাবাদী অর্ণব।
বাবা-মায়ের ছায়াহীন জীবনে দুই ভাই একে অন্যের ভরসা। অভাব আর প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই তারা এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নপূরণের পথে। অরিত্রের গোল্ডেন এ প্লাস যেন সেই কঠিন পথচলায় তাদের ঘরে জ্বলে ওঠা এক টুকরো আশার আলো।