সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলা লালমনিরহাটে চলতি মৌসুমে পাটের চাষাবাদ একপ্রকার থমকে গেছে। একসময় যে জেলার মাঠের পর মাঠ সবুজ পাট গাছে ছেয়ে থাকত, সেখানে এবার পাটের খেত খোঁজা দায়। কৃষকের অনিচ্ছা, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে জেলায় পাট চাষে নজিরবিহীন ধস নেমেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লালমনিরহাট জেলা কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে পাট চাষে ক্রমাগত অবনতির এক উদ্বেগজনক চিত্র ভেসে ওঠে। ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩,৮৫০ হেক্টর।
অর্জিত হয়েছিল ৩,৭২০ হেক্টর। মোট উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৫,৫০০ বেল পাট। ২০২৩-২৪ মৌসুম গত বছর অর্জিত পাট চাষের জমি কমে দাঁড়ায় প্রায় ২,৪০০ হেক্টরে। উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ২২,৫০০ বেলে।
চলতি (২০২৪-২৫) মৌসুম চলতি বছর কৃষি বিভাগ প্রায় ১,৮০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে চাষ হয়েছে ৩০০ হেক্টরেরও কম, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
স্থানীয় কৃষিবিদ ও কৃষকদের সাথে কথা বলে পাট চাষের এই নাজুক পরিস্থিতির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা গেছে—
১. উৎপাদন খরচের বিপুল বৃদ্ধি ডিজেল, সার ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক বাড়ায় প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।
২. পানির অভাব ও পচানোর সংকট সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় পাটের রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি, খাল-বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পাট পচানোর (জাগ দেওয়া) তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
৩. ন্যায্যমূল্যের অভাব বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি করতে হচ্ছে ২,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায়, যেখানে প্রতি মণ পাটের উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ২,৫০০ টাকা। ফলে প্রতি বিঘাতে কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বছর দুই বিঘা জমিত পাট খাড়িসিনু (চাষ করেছিলাম)। পাট পচাবার মতো কোনো পানি পাও নাই, শেষত দূরে নিয়া যাইয়া জাগ দেওয়া লাগছে। বিক্রি করিয়া খোরচা (খরচ)-ই উঠে নাই। তাই এবা আর পাটের দিকে যাই নাই, ওটে ভুট্টা আর ধান নাগাইছি।”
পাট চাষের এই ধারাবাহিক পতন জেলার পরিবেশ ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকির বার্তা দিচ্ছে। সোনালী আঁশের এই সোনালী ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারলে জেলার পাটভিত্তিক শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
পরিস্থিতি স্বীকার করে লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, “আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পাট পচানোর জলাশয়ের ঘাটতি কৃষকদের অন্য ফসলে উৎসাহিত করছে। পাট চাষে কৃষকরা ভুট্টা ও সবজির দিকে ঝুঁকছেন।
তবে আমরা আধুনিক রিবন রেটিং (ফিতা ফানেল) পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি, যাতে সোনালী আঁশের ঐতিহ্য লালমনিরহাট থেকে হারিয়ে না যায়।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সরকারিভাবে পাট ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করলে আগামী দিনে লালমনিরহাটের মানচিত্র থেকে পাট চাষ পুরোপুরি মুছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।