মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সীগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ও কারবার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সড়ক ও নৌপথের সহজ যোগাযোগ এবং রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী হওয়াকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে স্থানীয় কিছু অপরাধী চক্র, বেকারত্ব এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও মাদক ব্যবসা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে মুন্সীগঞ্জের মহাসড়ক ও সেতু-সংলগ্ন এলাকাগুলোকে নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের নৌপথও মাদক পাচারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীঘেরা এ জেলা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-ট্রানজিট এলাকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে নৌপথে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে মাদকের চালান আনা-নেওয়া তুলনামূলক সহজ হওয়ায় পাচারকারীরা এ পথকে বেশি ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় পর্যায়েও মাদক বিস্তারে ভূমিকা রাখছে কিছু অসাধু চক্র। দ্রুত অর্থ আয়ের আশায় বেকার যুবকদের একটি অংশ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মুন্সীগঞ্জ অপরাধীদের জন্য একটি সুবিধাজনক কেন্দ্র ও ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে।
জেলার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকা, বিশেষ করে লৌহজংয়ের কিছু অংশ ও চরাঞ্চল, মাদক কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এসব এলাকায় সহজেই মাদক মজুদ ও কেনাবেচা করা সম্ভব হচ্ছে।
এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন পাবলিক প্লেস, পরিত্যক্ত স্থান এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে—এমন এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডা বাড়ছে। স্থানীয় তরুণদের বেকারত্ব, হতাশা এবং কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব বৃদ্ধির কারণেও অনেকেই মাদকের চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও অপরাধী চক্র তরুণদের মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইনের চালান নদী ও সড়কপথে মুন্সীগঞ্জ হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আংশিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৩ জুলাই র্যাব ও পুলিশের পৃথক অভিযানে দুইজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৫ জুলাই ভোরে শ্রীনগরে অভিযান চালিয়ে ১১০ বোতল উইন কোরেক্স (ফেনসিডিলজাতীয় মাদক) ও ৩২ রাউন্ড গুলিসহ একজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। একই দিন পৃথক দুটি মাদকবিরোধী অভিযানে ১৩০ পিস ইয়াবাসহ তিনজন কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ডিবি ও টঙ্গীবাড়ী থানা পুলিশ।
২৬ জুলাই ২৪ ঘণ্টার নিয়মিত অভিযানে ২৪০ পিস ইয়াবা, ২০০ গ্রাম গাঁজা এবং ১১০ বোতল ফেনসিডিলসহ নয়জন মাদক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ জুলাই বিশেষ অভিযানে এক হাজার পিস ইয়াবা ও ৩৫ গ্রাম হেরোইনসহ একজন পেশাদার মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে পৃথক অভিযানে আরও ১৩০ পিস ইয়াবাসহ সাতজন কারবারিকে আটক করা হয়।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম, পিপিএমের কঠোর নির্দেশনায় পুরো মাসজুড়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতিতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এ অভিযান ভবিষ্যতেও একইভাবে চলবে।