মাঠজুড়ে সবুজ হয়ে ওঠা সদ্য রোপণকৃত ধানের চারা। সেই চারার প্রতিটি পাতায় লেগে আছে কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম আর এক বুক স্বপ্ন। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চোরচক্রের হানায় মুহূর্তেই যেন সেই স্বপ্নে নেমে এসেছে কালো ছায়া।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের পিপলা গ্রামে এক রাতেই চুরি হয়ে গেছে ১২টি সেচ মোটর। হঠাৎ এমন ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকে এখন ভাবছেন—সেচ না পেলে হয়তো বাঁচবে না তাদের সোনালি ফসল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গ্রামের বিভিন্ন মাঠে বসানো সেচ পাম্পের মোটর খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার ভোরে প্রতিদিনের মতো জমিতে সেচ দিতে এসে কৃষকরা দেখেন, পাম্পঘর ফাঁকা।
যেখানে ছিল তাদের জীবিকার প্রধান ভরসা, সেখানে পড়ে আছে শুধু খোলা তার আর ভাঙা তালার চিহ্ন। একে একে খবর ছড়িয়ে পড়লে জানা যায়, একই রাতে গ্রামের অন্তত ১২টি সেচ মোটর চুরি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন মো. আব্দুল আলিম মৃধা, রশিদ ফকির, আফজাল ফকির, আলাল শেখ, সাইফুল ইসলাম, রবিউল করিম (তিনটি মোটর), সুবির প্রামাণিক, বক্কার হাজি, জরিপ ও সাত্তার প্রামাণিক। কৃষকদের দাবি, সব মিলিয়ে এক রাতেই ১২টি সেচ মোটর চুরি হয়েছে। এতে তাদের কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবুজে মোড়া ধানের ক্ষেত যেন কৃষকের নীরব আর্তনাদের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের পাশে সারিবদ্ধ পাম্পঘরগুলোতে নেই কোনো সেচ মোটর; কোথাও কাটা বৈদ্যুতিক তার, কোথাও ভাঙা তালা, আবার কোথাও মোটর খুলে নেওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন। প্রতিটি পাম্পঘর যেন রাতের অন্ধকারে সংঘটিত সংঘবদ্ধ চুরির নির্বাক সাক্ষ্য বহন করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দল বেঁধে ঘটনাস্থলে এসে হতাশ কণ্ঠে নিজেদের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন। তাদের ভাষায়, একটি সেচ মোটর শুধু একটি যন্ত্র নয়—এটাই তাদের ফসল বাঁচানোর শেষ ভরসা। সেই ভরসা এক রাতেই হারিয়ে যাওয়ায় এখন পুরো মৌসুমের ফসল নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল আলিম মৃধা বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে টাকা জমিয়ে মোটর কিনেছিলাম। রাতের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। সকালে জমিতে এসে মনে হয়েছে, যেন বুকের ভেতর থেকে কেউ সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন সেচ দেব কী দিয়ে?”
আরেক কৃষক বলেন, “ধানের জমিই আমাদের বাঁচার অবলম্বন। মোটর না থাকলে ফসল বাঁচবে না। ফসল না হলে সংসার চলবে কীভাবে? আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ,সম্প্রতি গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে সেচ মোটর চুরির ঘটনা বেড়েই চলেছে। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন কৃষকরা। এর আগে গত বুধবার পৌর সদরের খামারনাচকৈড়ের দুখা ফকিরের মোড়সংলগ্ন মাঠ থেকেও একটি সেচ মোটর চুরি হয়। কিন্তু একের পর এক
এমন ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত চোরচক্রের সদস্যদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। তারা দ্রুত চোরদের আইনের আওতায় এনে চুরি হওয়া সেচ মোটর উদ্ধারের পাশাপাশি মাঠে নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুরুল আলম বলেন, “এখনো থানায় এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে এই বিষয় কোন অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”