ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে কোটাবিরোধী আন্দোলনের স্লোগানে। ১৪ জুলাই দিনটি ঘিরে শতশত শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে, মুখে ছিল সেই পুরনো কিন্তু এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা স্লোগান—“তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার।” গত বছরের এই তারিখে ঘটে যাওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন নতুন করে দানা বাঁধে, যার রেশ কাটেনি বরং নতুন উদ্দীপনায় তা ফিরে এসেছে।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, যদি দুইজন সমান মেধাবী প্রার্থী থাকেন—একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং অন্যজন রাজাকারের সন্তান—তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকেই চাকরির জন্য বেছে নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। বহু শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিক মনে করেন, এটি কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়নের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। অনেকের চোখে এটা ছিল রাজনীতিকভাবে বিভাজন তৈরির চেষ্টা, যা মেধার মূল্যায়নের প্রশ্নে সাংঘর্ষিক।
এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা রাতেই মিছিল নিয়ে টিএসসিতে এসে জড়ো হন। তাদের মুখে ছিল ক্ষোভ, অপমানের জবাব এবং নিজের পরিচয়ের দাবি। শুধু ছাত্ররাই নয়, ছাত্রীদের অংশগ্রহণও ছিল লক্ষণীয়। অনেক ছাত্রী হলের গেট ভেঙে আন্দোলনে যোগ দেন। স্লোগান উঠে: “চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”, “কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” পুরো ক্যাম্পাস একপ্রকার বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়। আন্দোলনের ঢেউ শুধু ঢাবি নয়, দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ছাত্রলীগ হলে হলে অবস্থান নেয় এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। আন্দোলন যে স্তিমিত হয়ে আসছিল, তা আবারও প্রাণ ফিরে পায়। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, কোটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার, সেটিকে রাজাকারের উত্তরসূরি বলে আখ্যা দেওয়া নিছক অবিচার। তাই তারা আর চুপ করে না থেকে রাজপথে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে তোলে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কেবল শিক্ষার্থী সমাজে নয়, সরকারি মহলেও বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেক সাবেক আমলা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিক সামাজিক মাধ্যমে এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের অংশ বিশেষ নিয়ে তৈরি হতে থাকে কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও নানা রকম সমালোচনামূলক পোস্ট। এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক দ্বন্দ্বকেও উস্কে দেয় বলে অনেকে মনে করেন।
এই আন্দোলন এখন আর কেবল চাকরি পাওয়া না পাওয়ার বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে আত্মসম্মান ও স্বীকৃতির আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা নিছক সুবিধা চায় না; তারা চায় সম্মান, ন্যায্যতা এবং পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে বিচার, অপবাদ বা তিরস্কার নয়। ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার’—এই স্লোগান আজ কেবল প্রতিবাদের নয়, বরং একপ্রকার প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই প্রজন্ম আর রাজনীতির ভুল ব্যাখ্যায় নিজেদের পরিচয় হারাতে চায় না। তারা ইতিহাসকে সম্মান করে, তবে বিভাজন নয়, চায় সাম্য আর স্বচ্ছতা।
এই আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছে, কোনো দমন-পীড়ন, কোনো রাজনৈতিক কৌশল, কোনো অপমানের ভাষা—তাদের চেতনাকে দমাতে পারবে না। বরং সম্মান ও ন্যায়বিচারহীন একটি বক্তব্যই কিভাবে আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার এক জীবন্ত প্রমাণ হয়ে থাকবে ১৪ জুলাইয়ের এই ঘটনাবলি। এটি কেবল একটি তারিখ নয়, এক নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের দিন হিসেবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে।