সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার পর সংবিধানের মৌলিক সংশোধনগুলো নিয়ে দেশে আবার গণভোট হবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সংবিধানের মৌলিক সংশোধনী গণভোটে দেওয়া হবে। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
গতকাল রোববার সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রেস ক্লাব ও সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়।
জুলাই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নোট অব ডিসেন্টসহ সংবিধান সংশোধনের কাজ হচ্ছে। তাহলে আবার গণভোটের প্রয়োজন আছে কি না। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই গণভোট হবে।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপর আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের বছরের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন হতে পারে। সংসদে আলোচনা ও বিল পাসের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে মৌলিক সংশোধনগুলো গণভোটে দেওয়া হবে।
সাংবিধানিক গণভোটের বিষয়ে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে আগে বিধান ছিল জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি বাতিল করা হয়েছিল।
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা হয়েছে, তাতে রায় এসেছে। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান আবার কার্যকর হওয়ার পর সাংবিধানিক গণভোটের বিষয়টি যথাযথভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানে এমন কোনো পরিবর্তন আনা হলে, যাতে প্রস্তাবনা, কোনো অনুচ্ছেদ বা ১৪২ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আসে, তাহলে সেই সংশোধনীতে গণভোট দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সংশোধনীটি গণভোটের জন্য পাঠানো হবে। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
মতবিনিময় সভায় সম্পাদকদের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের কাজে বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পাদকদের অনেকে প্রস্তাব দিয়েছেন, বিরোধী দলের সদস্যদেরও কমিটিতে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো উচিত। ক্ষমতাভিত্তিক বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কাজটি করা হলে ভালো হবে।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা তো একমত। আমরা বারবারই তাদের আহ্বান জানাচ্ছি। তারা যখনই এই কমিটিতে যোগদান করবেন, আমরা স্বাগত জানাব। সংসদ চলাকালীনও বারবার আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা আসুন, কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন। আপনাদের যেসব বক্তব্য আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
আলোচনার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবগুলো সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে তাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অনেক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হতো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি না থাকুক। জুলাই জাতীয় সনদ আমরা যেভাবে স্বাক্ষর করেছি, সেভাবে বাস্তবায়ন করব।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। যেসব বিষয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি অথবা পরিহার করা হয়েছে, সেগুলোও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চায় সরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে বিএনপির আরও অনেক প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া আলোচনার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও মনোভাব ধারণ করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হবে। তবে কিছু বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেগুলো সেভাবেই বিবেচনা করা হবে।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা আমাদের রিপোর্টটা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতে পারি, সেই চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, আমি আশা করি, জানুয়ারি সেশনে, যেটা বছরের প্রথম অধিবেশন হবে, সেই সেশনে বিলটা আসতে পারে।
সংবিধান সংশোধনে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুতি রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানের প্রস্তাবনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
একই বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদেও ছিল। এগুলো আমরা বলেছি, এগুলো আমাদের প্রতিশ্রুতি। এগুলো আমাদের ইশতেহারে আছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আজকের বিরোধী দলও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছিল।
তবে কোনো কারণে বিষয়টি কমিশনের আলোচনায় সর্বসম্মতভাবে আসেনি বলে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সভায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিভিন্ন মতামত, প্রস্তাব ও পরামর্শ পাওয়া গেছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় সবাই বক্তব্য দিয়েছেন। অনেকে লিখিতভাবে প্রস্তাব পাঠাবেন বলেও মত দিয়েছেন। কমিটির পক্ষ থেকেও লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈঠকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আপনাদের (সম্পাদক) পরামর্শ অনুযায়ী বিরোধী দলের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর ব্যাপারে আমরা উদগ্রীব। আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই সংবিধান সংশোধন করতে চাই।
বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দেন। তিনি বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দেন। এ ছাড়া সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বিভিন্ন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি দলের প্রভাবমুক্ত রাখার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষেও মত দেন তিনি।
সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রসঙ্গ তুলে নিউএজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, পৃথিবীর কোনো সংবিধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইন করা হয় না। সুরক্ষা প্রয়োজন সংখ্যালঘুদের।
তিনি সংবিধানে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ শব্দের পরিবর্তে নাগরিকদের সম্মানিত করে এমন কোনো শব্দ সংযোজনের পরামর্শ দেন। ‘প্রজা’ শব্দ নিয়ে আপত্তি জানান তিনি।
সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিলের প্রস্তাব দেন। তিনি সংবিধানের চরিত্রে একাত্তরের চেতনা, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা এবং সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বৈঠকে অংশ নেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফী, দৈনিক নয়াদিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক প্রমুখ।
এ ছাড়া বৈঠকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।