সাইফুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা):
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা খুলনার কয়রা। একদিকে নদী, অন্যদিকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদীঘেরা জনপদ ও উপকূলীয় মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের এমন সমন্বয় কয়রাকে পর্যটনের জন্য করে তুলেছে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে চিত্রল হরিণের দল। জঙ্গলের গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানর। নদীর পানিতে কখনো দেখা মেলে কুমিরের, কখনো ভেসে ওঠে শুশুক। সুন্দরী, গরান, কেওড়া, গেওয়া, পশুর ও গোলপাতাসহ ম্যানগ্রোভ বনের নানা প্রজাতির গাছের সমাহারে জায়গাটি যেন সুন্দরবনেরই একটি অংশ।
এমনই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা খুলনার কয়রা উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরের কেওড়াকাটা। পর্যটনের জন্য প্রকৃতির অপার আয়োজন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এখানে নেই পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো। পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ, অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের পরও পাঁচ বছর ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি সামনে রেখে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এমন অপার সম্ভাবনার পরও কয়রার পর্যটন কেন বারবার কাগজ-কলমেই আটকে থাকবে?
কয়রায় পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় একটি পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। একই অর্থবছরে খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দুই কিস্তিতে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়।
কিন্তু গোলখালীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে গেলে বন বিভাগের আপত্তি দেখা দেয়। নির্ধারিত স্থানটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত হওয়ায় সেখানে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরে ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমতিতে স্থান পরিবর্তন করা হয়। সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের কেওড়াকাটায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
স্থান পরিবর্তনের পরও কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। কিন্তু এখনো শুরু হয়নি নির্মাণকাজ।
কয়রা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে শাকবাড়িয়া নদীর তীরে ৬ নম্বর কয়রা গ্রাম। নদীর এক পাশে লোকালয়, অন্য পাশে সুন্দরবন। লোকালয়ের বেড়িবাঁধ ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে ঘন সবুজ বন। গোলপাতা থেকে শুরু করে সুন্দরী, গরান, কেওড়া, গেওয়া, পশুরসহ ম্যানগ্রোভ বনের নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে সেখানে।
নদীর পাড় থেকে তাকালেই দেখা যায় সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। জঙ্গলের ধারে ঘাস খায় চিত্রল হরিণ। গাছের ডালে ডালে ছোটাছুটি করে বানর। শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে দেখা মেলে কুমির ও শুশুকেরও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর ওপারে সুন্দরবনের ভেতরে রয়েছে কেওড়াকাটা নামের একটি খাল। সেই খালের নাম থেকেই নদীতীরবর্তী এ এলাকার নাম হয়েছে কেওড়াকাটা। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের এমন সমন্বয় পর্যটকদের জন্য এলাকাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৬ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক ফরহাদ হোসেন বলেন, তিন বছর আগে তাঁর এলাকার নদীর চরের বাগানে কেওড়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের খবর শুনে তাঁরা আনন্দিত হয়েছিলেন। প্রশাসনের লোকজন এসে জায়গা পরিদর্শন করে লাল পতাকাও টানিয়ে গিয়েছিলেন।তবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবিত জায়গার পাশের বাসিন্দা সরদার নাজমুস সয়াদাত বলেন, বাইরে থেকে অনেক মানুষ সেখানে ঘুরতে আসেন। তাঁরা নদীর পাড়ে বসে কিংবা নৌকায় করে সুন্দরবনের দৃশ্য উপভোগ করেন। পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হলে পর্যটকেরা আরও বেশি সময় সেখানে কাটাতে পারবেন।তাঁর মতে, পর্যটনকেন্দ্র হলে স্থানীয় মানুষের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
কয়রার পর্যটন সম্ভাবনা শুধু সুন্দরবনকেন্দ্রিক নয়। উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর মধ্যে মসজিদকুঁড়ের ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ, রাজা প্রতাপাদিত্যের বাড়ি, খালে খাঁর ৩৮ বিঘা দিঘি এবং আমাদী বুড়ো খাঁ-ফতে খাঁর দিঘি উল্লেখযোগ্য।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে দক্ষিণ বেদকাশী, গোলখালী, কেওড়াকাটা, ৪ নম্বর কয়রা ও সুন্দরবনসংলগ্ন অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকাকেও পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনা যেতে পারে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে অবস্থিত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় পর্যটনকেন্দ্রের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে শুধু কয়রা নয়, আশপাশের এলাকাতেও পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। সুন্দরবনের পাশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গ্রামও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, “বন বিভাগের আপত্তির কারণে পর্যটনকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হওয়ায় সময় লেগেছে। বর্তমানে নির্ধারিত কেওড়াকাটা এলাকায় বন বিভাগের কোনো আপত্তি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
কয়রায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা। কেওড়াকাটার মতো এলাকায় হরিণ, বানর, কুমির, শুশুকসহ নানা বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে। তাই পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে এমনভাবে, যাতে বন্যপ্রাণী ও সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বড় বড় স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ওয়াকওয়ে, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে পর্যটনভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
কয়রার পর্যটন নিয়ে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ এখানেই—সম্ভাবনার অভাব নেই, অভাব বাস্তবায়নের গতিতে।
২০২১ সালে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন, ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ, স্থান নির্বাচন, পরিদর্শন, পরে বন বিভাগের আপত্তির কারণে স্থান পরিবর্তন—সবই হয়েছে। এরপর কেওড়াকাটায় নতুন জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, নতুন নকশাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখনও শেষ হয়নি কাঙ্ক্ষিত পর্যটন অবকাঠামো।
অথচ প্রতিদিনই প্রকৃতি নিজের মতো করে পর্যটকদের টেনে আনছে। নদীর পাড়ে মানুষ আসছে, সুন্দরবনের দৃশ্য দেখছে, নৌকায় ঘুরছে, হরিণ দেখছে—তারপর কোনো পর্যটনসেবা ছাড়াই ফিরে যাচ্ছে।
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা কয়রায় যেখানে প্রকৃতি নিজেই পর্যটনের আয়োজন করে রেখেছে, সেখানে একটি পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন—এই প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের।
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসে যখন দেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হবে, তখন কয়রাবাসীর প্রত্যাশা একটাই—প্রস্তাব, পরিদর্শন আর নকশার গণ্ডি পেরিয়ে এবার বাস্তবায়ন হোক কেওড়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র।
কয়রার মানুষের বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদী, সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন চালু হলে নৌযান, স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান, আবাসন, পর্যটক গাইড, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সুন্দরবনের পর্যটনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণায় ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। একটি গবেষণায় সুন্দরবনের পর্যটনকে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একটি ইকোসিস্টেম সার্ভিস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ, হাঁটার সুযোগ, তথ্যসমৃদ্ধ মানচিত্র ও নিরাপত্তা নির্দেশনা বাড়ানো গেলে পর্যটন আরও বাড়তে পারে বলেও গবেষণায় বলা হয়েছে।