কাওসার আহমেদ
প্রিয় সংসদ সদস্যকে একনজর দেখা আর কুশল বিনিময় করাই যেন তাঁর প্রতিদিনের অভ্যাস। দিনভর দিনমজুরের কাজ শেষে ক্লান্তি ভুলে ছুটে যেতেন প্রিয় মানুষটির কাছে। কিন্তু সেই মানুষটির কাচারিঘরে গিয়েই এবার কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামের দিনমজুর মমিন (৩৫)। তিন-চারটি বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে তাঁর দুই পা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। পরে তাঁকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও নির্ধারিত দিনে টিকা না দেওয়ায় সরকারি জলাতঙ্কের টিকা পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে হয়েছে তাঁকে।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার ধারাবারিষা গ্রামে সংসদ সদস্যের কাচারিঘরের সামনে এ ঘটনা ঘটে। মমিন মৃত হেনা প্রামাণিকের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মমিনের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর–বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ এলাকায় থাকলে নিয়মিত তাঁর কাচারিঘরে যেতেন মমিন। সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিরাও তাঁকে প্রায়ই সংসদ সদস্যের কাছে যাতায়াত করতে দেখেছেন। তাঁদের ভাষ্য, মমিন কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তাঁর প্রতি সংসদ সদস্যের বিশেষ স্নেহ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলেও সংসদ সদস্য বাড়িতে নেই জেনেও তাঁর ধারাবারিষার কাচারিঘরে বসে অপেক্ষা করছিলেন মমিন। এ সময় হঠাৎ তিন-চারটি বেওয়ারিশ কুকুর তাঁকে ঘিরে ধরে আক্রমণ করে। কুকুরগুলো তাঁর দুই পায়ে কামড় দিয়ে মাংস খুবলে নেয়। মমিনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে কুকুরগুলো তাড়িয়ে দেন। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
তবে হাসপাতালে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়েন মমিন। গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহে মাত্র দুই দিন—রবিবার ও বুধবার—কুকুর-বিড়ালের কামড়ের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার টিকা দেওয়ার নির্ধারিত দিন না থাকায় সরকারি টিকা পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে হয় তাঁকে।
মমিনের পরিবারে চার সদস্য। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। দিনমজুরির আয়ে চলা এই অসচ্ছল পরিবারের জন্য জরুরি টিকা বাইরে থেকে কিনে নেওয়া ছিল বাড়তি আর্থিক চাপ।
জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন টিকা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের ভাষ্য, কুকুরের কামড়ের পর দ্রুত প্রতিষেধক নেওয়া জরুরি। কিন্তু নির্ধারিত দিনের বাইরে হাসপাতালে গিয়ে টিকা না পেলে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই হাসপাতালে সার্বক্ষণিক টিকার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আলমাছ উদ্দীন সরকারি টিকার সীমিত সরবরাহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের কাছে ভ্যাকসিনের সরবরাহ কম আসে। বাধ্য হয়ে আমাদের সপ্তাহে কেবল রবিবার ও বুধবার—এই দুই দিন ভ্যাকসিন দিতে হচ্ছে। এ কারণেই সপ্তাহের অন্যান্য দিনে আসা রোগীদের সরকারি ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হয় না।”