মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
চারদিকে নদী, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা। পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় মুন্সীগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলের চরভিত্তিক এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল। এক চর থেকে অন্য চর, বাজার কিংবা ঘাটে যেতে অনেকেরই ভরসা এই যান। তবে জ্বালানির বাড়তি দামে সেই মোটরসাইকেলনির্ভর যাতায়াত এখন চালক ও যাত্রী—উভয়ের জন্যই বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
সরকারি নির্ধারিত দামে বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের চর এলাকার বিভিন্ন দোকানে খোলা ও বোতলে পেট্রোল-অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা লিটার দরে। ফলে সরকারি মূল্যের তুলনায় প্রতি লিটারে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে মোটরসাইকেলচালকদের।
চরাঞ্চলের দোকানদারদের ভাষ্য, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দূরবর্তী এলাকা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে আনতে পরিবহন ব্যয় বেশি হয়। সেই অতিরিক্ত খরচ সমন্বয় করতেই খোলা ও বোতলে জ্বালানি কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
জ্বালানির বাড়তি দাম সরাসরি প্রভাব ফেলছে মোটরসাইকেলচালকদের দৈনিক আয়ে। চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যে পথে ১০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন তেলের অতিরিক্ত খরচের কারণে একই পথে ১৫০ টাকা ভাড়া দাবি করতে হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি ৫০ টাকা ভাড়া চাইলে অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
একজন মোটরসাইকেলচালক বলেন, “আগে ১০০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে আমাদের কিছুটা লাভ থাকত। এখন তেলের দাম বেশি হওয়ায় ১৫০ টাকা চাইতে হয়। কিন্তু যাত্রী ১৫০ টাকা দিতে চান না। ফলে আগের ভাড়ায় চালালে তেলের খরচ বাদ দিয়ে হাতে তেমন কিছুই থাকে না।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের চরভিত্তিক এলাকাগুলোতে গণপরিবহনের সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে দিঘীরপাড়, হাসাইল, শিলই ও বাংলাবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চলে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতেও মোটরসাইকেলের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেশি। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্থানীয় পরিবহনব্যবস্থায়।
চালকদের ভাষ্য, প্রতিদিনের আয়ের একটি বড় অংশ জ্বালানি কিনতেই ব্যয় হয়ে যায়। এর বাইরে মোটরসাইকেলের তেল-রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। ফলে আগের মতো একইসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করেও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
তবে চালকদের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টিও সহজভাবে নিতে পারছেন না যাত্রীরা। তাঁদের অনেকেই নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। একই পথে ভাড়া ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকা হলে অতিরিক্ত ৫০ টাকা দেওয়া তাঁদের জন্যও কঠিন। ফলে জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব একদিকে চালকদের আয় কমাচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয় বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, চরাঞ্চলে মোটরসাইকেল ছাড়া অনেক সময় দ্রুত কোথাও যাওয়ার উপায় থাকে না। জরুরি প্রয়োজনে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগও কম। তেলের দাম বাড়ায় চালকেরা ভাড়া বাড়াতে চাইছেন, আবার সাধারণ মানুষও বাড়তি ভাড়া বহন করতে পারছেন না। এতে দুই পক্ষই সমস্যায় পড়েছেন।
চালকদের দাবি, চরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বিক্রয়মূল্যের বিষয়টি নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় যাতায়াত ভাড়া নির্ধারণে উদ্যোগ নেওয়া হলে চালক ও যাত্রী—দুই পক্ষের চাপই কিছুটা কমতে পারে।
দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে মোটরসাইকেল এখন কেবল একটি যানবাহন নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। তাই জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব শুধু মোটরসাইকেলচালকদের আয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত ব্যয়ের ওপরও।