সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
আমন মৌসুমের শুরুতেই লালমনিরহাটে সার সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। জেলার পাঁচ উপজেলা সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামে চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকট সবচেয়ে বেশি বলে মাঠপর্যায়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ১০ আগস্ট কালীগঞ্জে সরকার নির্ধারিত দামে চাহিদামতো সার না পাওয়ার প্রতিবাদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার কৃষক। তাঁদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে ‘স্টক শেষ’ বলা হলেও বাড়তি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমন উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সময়মতো সার না পেলে ফলনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি মূল্যের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে ৫০ কেজির এক বস্তা সার কিনতে হচ্ছে। তবে উপজেলা ও সারভেদে বাড়তি দামের পরিমাণ ভিন্ন বলে জানা গেছে। কৃষকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, অতিরিক্ত টাকা দিলেও অনেক সময় ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় না।
গত বছরও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় টিএসপি সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। সরকারি নির্ধারিত ১,৩৫০ টাকা মূল্যের টিএসপি বস্তা কোথাও ১,৬০০-১,৭০০ টাকা, আবার আদিতমারীতে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। পাটগ্রামেও বিভিন্ন সারের বস্তায় ২০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
কৃষি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জেলার সার চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ইউরিয়ার চাহিদা ৬৮,৯৩২ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৩৯,৬৯০ টন; টিএসপির চাহিদা ৩০,২১০ টনের বিপরীতে বরাদ্দ ১২,৭০২ টন। একইভাবে ডিএপি ও এমওপির ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম।
তবে বিএডিসির লালমনিরহাট গুদামের সহকারী পরিচালক একরামুল হক দাবি করেছেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং ১৪৪ জন ডিলারের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় ডিলারদেরও দাবি, তাঁদের বরাদ্দ কম হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ডিলার পয়েন্টে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তাঁরা অস্বীকার করেছেন।
কৃষক রেজাউল আলম অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সার না থাকার কথা বললেও বাড়তি টাকা দিলে সার পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে বাজার ও ডিলার পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত দামে বিক্রি বা মজুতের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত তিন বছরের আমন মৌসুমে উপজেলা-ভিত্তিক সার চাহিদা, বরাদ্দ, প্রকৃত উত্তোলন ও বিক্রয়মূল্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ্যে না থাকায় প্রকৃত ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। ফলে কৃষকদের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি নথি যাচাই করে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কৃষকদের আশঙ্কা, আমনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফলন কমতে পারে। এতে শেষ পর্যন্ত ধানের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।