সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি :
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার নির্ধারিত কোনো সময়সূচি না থাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনাও করতে পারছেন না।
গত কয়েকদিনে উপজেলার পৌরসভা, পাথারপুর, কীর্তনখোলা,সিলিমপুর,বেতুয়া, কচুয়া, আড়াইপাড়া, দামিয়াপাড়া, বানিয়ারছিটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দোকানপাট, ফটোকপি ও কম্পিউটার দোকান, মোবাইল সার্ভিসিং, ওয়েল্ডিং ও ফার্নিচার কারখানা, মোটরসাইকেল ও সিএনজির সিট তৈরির ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আর যাদের বিকল্প ব্যবস্থা নেই, তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী চার্জলাইট, মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট এবং মোমবাতির আলোয় পড়তে বাধ্য হচ্ছে। আবার ভোর সকালেও বিদ্যুৎ থাকে না -তাহলে বাচ্চারা পড়বে কখন?
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকলেও ছোট ক্লিনিকগুলোতে বিকল্প বিদ্যুৎ না থাকায় রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
একই সঙ্গে চালকল, আইসক্রিম কারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কাঠ ও আসবাবপত্র তৈরির কারখানাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
পাথারপুর এলাকার বাসিন্দা জনি সিকদার বলেন, দিনে রাত মিলিয়ে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। নামাজের সময়েও চলে যাচ্ছে। প্রতিবারই দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।
আমি বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে আইইএলটিএসের পড়াশোনা করছি। কিন্তু অতিরিক্ত গরম ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছি না।
উপজেলা সদরের মোটরসাইকেল ও সিএনজির সিট নির্মাতা নুরুল হক, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপের মালিক নুরুল ইসলাম, কাপড় ইস্ত্রির কারিগর মধুসূদন দাস এবং মোবাইল মেকানিক আব্দুল্লাহ বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে।
সময়মতো অর্ডারের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না, নতুন কাজও নেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎনির্ভর এসব পেশায় প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
সখীপুর পৌর শহরের কাপড় ব্যবসায়ী রাসেল বলেন,ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে ক্রেতারা বাজারে আসছেন না। ফলে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে।
কালিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক মোবারক হোসেন বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। প্রচণ্ড গরমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই কষ্ট পাচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় গ্রিন লাইফ ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রোগীদের সেবা সচল রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, আর বিদ্যুৎ না থাকলে অসহনীয় গরমে রোগীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।তিনি বলেন, কতক্ষণ আর জেনারেটর চালু রাখা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি প্রতিমা বংকি গ্রামের হুরমুজ আলিও বিদ্যুৎ না থাকার কথা বলেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে (২৮ জুলাই) দেখা যায়, আউটডোরে যারা চিকিৎসা নিতে আসছেন সবাই গরমে হাসফাস করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দিন ধরে এই পরিস্থিতি চলছে। তারা দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে সখীপুর উপজেলা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ (বিপিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাব্বির হোসেন বলেন, টাঙ্গাইল গ্রিড থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রায় ১৫ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া ভালুকা থেকে ৫–৬ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা থাকলেও। সেখানে ৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া লাগছে। গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটির ওপর নির্ভর করেই পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিচালনা করতে হচ্ছে আমাদের।
তবে আমরা আশাবাদী, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।