রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সংঘটিত এই হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাসী হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। হামলায় বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এছাড়া দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা এবং আহত হন আরও অনেকে।
ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলার বিচারিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে দুটি ধাপ অতিক্রম করেছে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট সেই সাজা পরিবর্তন করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছয়জন হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিভ টু আপিল করেছেন। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ রানা জানান, মামলাটি কার্যতালিকায় এলে রাষ্ট্রপক্ষ শুনানির আবেদন করবে।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ। তাদের মধ্যে আসলাম হোসেন ২০২৫ সালের ৬ জুন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি পালানোর ঘটনায় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্তে প্রমাণিত হয় যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর উগ্রপন্থি অংশ ‘নব্য জেএমবি’ পরিচয়ে এই হামলা চালিয়েছিল। অভিযানে অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়।
সেদিন যা ঘটেছিল
২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার সন্ধ্যার পর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের আনাগোনা চলছিল। ইফতারের কিছুক্ষণ পর অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন জঙ্গি রেস্তোরাঁয় ঢুকে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
খবর পেয়ে পুলিশ, র্যাব, সোয়াট, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলেন। প্রথম দফায় উদ্ধার অভিযানে গেলে হামলাকারীদের হামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান গুরুতর আহত হন। পরে তারা মারা যান।
রাতভর জিম্মিদের স্বজনরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ঘটনাস্থলের বাইরে অপেক্ষা করেন। পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়।
অভিযানে ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে ২০ জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই নৃশংস হামলার স্মৃতি এবং ক্ষত এখনো দেশের মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।