দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিন মাস আগে দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং জনদুর্ভোগ’ শীর্ষক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোর কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী সরকারের এ আহ্বানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নতুন করে পরিকল্পনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ প্রায় তিন মাস আগেই সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ১০ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, গত ২১ মে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দেন। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য ছিলেন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সদস্যও ছিলেন। তারা দুটি বৈঠকে অংশ নিয়ে সংকটের কারণ ও সমাধান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। পরে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, প্রস্তাবগুলোর মধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা, স্থল ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
এ ছাড়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালু, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং, নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাবও ছিল বলে জানান তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এখন প্রশ্ন নতুন পরিকল্পনা আছে কি না, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন সুপারিশের কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনও কাগজে পড়ে আছে। জনগণের সামনে এসব তথ্য পরিষ্কার করা উচিত।
তিনি বলেন, বিরোধী দল শুধু সমালোচনা করেনি; সংকট মোকাবিলায় সময়মতো বাস্তবসম্মত বিকল্পও দিয়েছে। গত ১৪ আগস্ট জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংকট নিরসনে সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন। এর একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছে।
গত ৮ আগস্ট জামায়াতের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জ্বালানি সংকট নিরসনে দেওয়া প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন পরওয়ার। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, দ্রুত ফলনশীল কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থল ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করা, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও তাদের প্রস্তাবে ছিল। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমীক্ষার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরওয়ার বলেন, পরিকল্পনা যখন ২১ মে থেকেই সরকারের হাতে রয়েছে, তাহলে গত প্রায় তিন মাসে এর কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটির কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনটি গ্রহণ করা হয়নি—তা জানানো প্রয়োজন। কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে এর কারণও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। নতুন পরিকল্পনা জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ইতোমধ্যে দেওয়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চায় জামায়াতে ইসলামী।
জ্বালানি সংকট নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফ্যান চলছিল কি না, সেটি দিয়ে দেশের সামগ্রিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁর মতে, প্রতিবাদের কোনো প্রতীকী ছবি নিয়ে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ না করে সংকটের বাস্তবতা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে উল্লেখ করে পরওয়ার বলেন, জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে শিল্পকারখানা, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ সংকটে পড়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, মানুষ চুলায় গ্যাস, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এসব দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মাধ্যমে নয়, কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জামায়াতে ইসলামী চার দফা প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের অগ্রগতি ৯০ দিনের মধ্যে জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানায় দলটি।