বিরোধী দলকে দুর্বল করার রাজনৈতিক প্রবণতার সমালোচনা করে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদে পারস্পরিক সম্মান ও গঠনমূলক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে বিভক্ত বা দুর্বল করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সহায়ক নয়।
সোমবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “একটা চমৎকার প্রবণতা লক্ষ্য করছি। প্রায় সবাই কুচিকুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচিকুচি করার জন্য আসি নাই।”
তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে সমর্থন করা যেমন বিরোধী দলের দায়িত্ব নয়, তেমনি কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করাও উচিত নয়। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতার মনোভাব থাকা প্রয়োজন।
সংসদকে সরকারি দল ও বিরোধী দল—এই দুই ‘চাকার’ ওপর চলা একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, অতীতের ব্যক্তিপূজা, তোষামোদ ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি মন্তব্য করেন, জনগণের করের অর্থ ব্যয় করে সংসদে ব্যক্তিবন্দনা নয়, জনগণের কল্যাণে কার্যকর আলোচনা হওয়া উচিত।
আগের দিনের সংসদীয় আলোচনায় জামায়াতকে নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান, সংসদে যেন কোনো সদস্যের চরিত্রহননমূলক বক্তব্য না আসে।
বাজেট আলোচনায় তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং চীনের সহযোগিতায় প্রধান নদী ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।”
স্বাস্থ্য খাতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল, যন্ত্রপাতি ও সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে সমান মানদণ্ডে তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান কওমি মাদ্রাসার জন্য বাজেটে বরাদ্দ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফেরত আনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মূল্যায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।
উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। অন্যথায় দেশ দীর্ঘদিন আমদানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।
পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এসব মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে পাচার হওয়া অর্থের সামান্য অংশও যদি ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে বাজেট ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পাচারকারীদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক আর্থিক চাপ কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে কর পরিশোধে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়বে।
প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।