চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায় তেহরান। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এর প্রভাবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত ও বাহরাইনের বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ইরানের হামলায় দুবাই, আবুধাবি, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তার কারণে কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে প্রায় এক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে আকাশসীমা খুলে দেওয়া হলেও যুদ্ধের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ক্ষতির মুখে বিমান পরিবহণ খাত
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ কমেছে। কমেছে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের চলাচলও। পাশাপাশি জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহণ খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) জুনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলো ২০২৫ সালে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করলেও ২০২৬ সালে প্রায় ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার নিট লোকসানের মুখে পড়তে পারে।
এমিরেটস, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলো বেশিরভাগ রুটে ফ্লাইট চালু করলেও এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এমিরেটসের প্রধান নির্বাহী টিম ক্লার্ক জুনে জানিয়েছিলেন, তাদের উড়োজাহাজগুলো প্রায় ৭৫ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি বিমান সংস্থা এখনো মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে ফ্লাইট চালু করেনি। এয়ার ফ্রান্স আগস্টের শেষ দিকে এবং লুফথানসা সেপ্টেম্বরে ফ্লাইট পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স অক্টোবরের শেষ দিকে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এয়ার কানাডা ২০২৭ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝির আগে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে না। আবার অনেক বিমান সংস্থা এখনো ফ্লাইট পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময় জানায়নি।
আকাশসীমা খুললেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। মাঝে মাঝে আকাশসীমা বন্ধ হওয়া এবং বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির (ইইউএএসএ) সর্বশেষ সতর্কতায় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইউএই এবং ওমান উপসাগরের একটি অংশের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে যাত্রীদের বিকল্প ভ্রমণপথও সীমিত হয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে ইউএই থেকে লন্ডনগামী যাত্রীদের জন্য দুবাই থেকে এমিরেটস, আবুধাবি থেকে ইতিহাদ কিংবা শারজাহ থেকে এয়ার অ্যারাবিয়া প্রধান বিকল্প হিসেবে রয়েছে। একই সময়ে দোহা থেকে টোকিও যাওয়ার ক্ষেত্রে কাতার এয়ারওয়েজই সরাসরি ফ্লাইটের একমাত্র বিকল্প।
ঝুঁকিতে উপসাগরীয় বিমান সংস্থার ব্যবসায়িক মডেল
উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বিমান সংস্থাগুলো মূলত ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেলের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দুবাই, দোহা বা আবুধাবির মতো বড় বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। যাত্রীরা এসব কেন্দ্রীয় বিমানবন্দরে এসে অন্য ফ্লাইটে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছান।
ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝামাঝি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যবসায়িক মডেল থেকে সুবিধা পেয়ে আসছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তবে চলমান সংঘাত এই ব্যবস্থাকেই নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির এভিয়েশন লেকচারার নাভিদ কাপাডিয়ার মতে, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের মতো বিমান সংস্থার প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় তারা বাজারের বড় অংশ ধরে রাখতে পারছে এবং তুলনামূলক বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে তাদের ব্যবসা মূলত দুবাই ও দোহাকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক যাত্রী দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিবহণের ওপর নির্ভরশীল।
আইএটিএর জুনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী পরিবহণের চাহিদা গত বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল বেড়েছে ১১ শতাংশ। এতে উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলের ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, কমছে সক্ষমতা
সংঘাতের কারণে অনেক উড়োজাহাজকে দীর্ঘ ও তুলনামূলক কম কার্যকর রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে পাইলট ও ক্রুদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে এবং উড়োজাহাজের ব্যবহারও কমে যাচ্ছে।
সম্ভাব্য ফ্লাইট বিঘ্নের কথা মাথায় রেখে অনেক বিমান অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করছে। এর ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের জন্য উড়োজাহাজে থাকা জায়গা কমে যাচ্ছে।
‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতাও এই সংকটের সময়ে সামনে এসেছে। কোনো একটি রুটে সমস্যা দেখা দিলে উড়োজাহাজ ও ক্রুরা দূরবর্তী বিমানবন্দরে আটকা পড়তে পারেন। এতে পুরো নেটওয়ার্কে একের পর এক ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব কিছুটা কমে এলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহণ খাত এখনো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক মডেল এবং আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের প্রচলিত কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?