ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগরে জাহাজে নতুন করে হামলার খবরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো ধরনের সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। একই সময়ে মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে আলোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। খবর রয়টার্সের।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শান্তি চুক্তি বা সমঝোতার পথে পরিস্থিতি আবারও এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, “গত দুই-তিন দিনের সংকেত বলছে, আমরা কোনো এক ধরনের সমঝোতার খুব কাছাকাছি।”
এদিকে মঙ্গলবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। আরাঘচির টেলিগ্রাম চ্যানেলে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও আলোচনার বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এর আগে একই দিন এক ব্রিফিংয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে আলাদা আলোচনা ‘অগ্রসর পর্যায়ে’ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চলমান সংঘাতে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশ ইরান ও লেবাননের নাগরিক। পাল্টা জবাবে ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
সমঝোতার আশায় কমেছে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। এর আগে দিনের শুরুতে এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল তেলের দাম। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনও দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে।
রোববার ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, শুধু ওই চুক্তি হলেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইরানের দেওয়া শর্তগুলোর বেশিরভাগই গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাত অবসানে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধের মতো বিষয় রয়েছে।
রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
এর পরদিন সোমবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন কিছু দাবি তোলেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, গত ৫০ বছরে ইরান যে ক্ষতি করেছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ চাইবে। পাশাপাশি ইরানের বেসামরিক বিক্ষোভকারী এবং ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের মৃত্যুসহ বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির জন্যও ইরানকে অর্থ দিতে হবে বলে দাবি করেন তিনি।
দুটি জাহাজে হামলার খবর
কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার মধ্যেই উপসাগরীয় ও লোহিত সাগর এলাকায় জাহাজে নতুন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে একটি ছোট কার্গো জাহাজে সন্দেহভাজন হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলাটি ইরান-সমর্থিত হুথিদের চালানো বলে ধারণা করা হলেও গোষ্ঠীটি এখন পর্যন্ত দায় স্বীকার করেনি।
এদিকে মিশরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ নামের একটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেলেও এতে হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ওমান উপসাগর দিয়ে পাকিস্তানের উপকূলের কাছে যাওয়ার সময় একটি কনটেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। সূত্রের বরাতে ঘটনাটিকে সন্দেহভাজন মার্কিন হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরের দিকে যাওয়া জাহাজ চলাচলে আরোপিত নৌ অবরোধ বাস্তবায়নে নিয়োজিত সদস্যদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার থেকে জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়।
ইরানের বন্দরের দিকে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণা প্রথমবার এপ্রিলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুনের শান্তি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর জুলাইয়ে তা আবারও কার্যকর করা হয়।
এদিকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে হুথিরা। গত ২০ জুলাই দেওয়া ঘোষণায় গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের কথিত ‘অবরোধের’ জবাবে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়। তবে ইয়েমেনে কোনো ধরনের অবরোধ আরোপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিয়াদ।
অনিশ্চিত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ
যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধটি ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। কয়েক মাস পর দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এর পাশাপাশি জ্বালানির উচ্চমূল্যও মার্কিন ভোটারদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে চলা মার্কিন সামরিক অভিযান—যার মধ্যে জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের ব্যাপক হামলাও ছিল—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে পারেনি।
তবে ট্রাম্প এরই মধ্যে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে। এমনকি তিনি বলেছেন, এই মুহূর্তে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?