সাইফুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:
তিন মাস অপেক্ষার পর সুন্দরবনের দুয়ার খুলেছে। দীর্ঘদিন পর মাছ ও কাঁকড়া ধরে সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার বনজীবীরা। কিন্তু সেই স্বপ্নে এখনো বাধা হয়ে আছে বৈরী আবহাওয়া, নদীর মরা কাটাল, হাতে টাকার সংকট এবং সুন্দরবনে দস্যুদের চাঁদার আতঙ্কের অভিযোগ।
ফলে সরকারি অনুমতি নেওয়ার পরও অনেক জেলে সুন্দরবনে যেতে পারছেন না। কেউ কেউ আবার অনুমতি নেওয়ার ঝুঁকিই নেননি। এতে নিষেধাজ্ঞার তিন মাসের পরও আয়-রোজগারহীন অবস্থায় দিন কাটছে উপকূলের অনেক পরিবারের।
কয়রা উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা এলাকার জেলে আলামিন শেখ বলেন, ‘অপেক্ষায় ছিলাম কবে সুন্দরবনে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে। তিন মাস পর অনুমতি পেলাম। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টি, মরা কাটাল আর চাঁদার টাকা ম্যানেজ করতে না পারায় যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম পরিবারের মুখে হাসি ফোটাব, কিন্তু সেটা আর হলো না।’
বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় বনে প্রবেশ বন্ধ থাকে। চলতি বছরও ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয় বনের দুয়ার।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কয়রার অধিকাংশ জেলে পরিবারের কাছে নিষেধাজ্ঞার তিন মাস ছিল কঠিন সময়। মাছ-কাঁকড়া ধরতে না পারায় অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। এখন বনে যেতে পারলে সেই ঋণ শোধের আশা তাঁদের।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন নদীতে মাছ ধরছিলেন আমজেদ গাজী। তিনি বলেন, ‘তিন মাস বনে ঢুকতে পারিনি। খুব কষ্টে দিন গেছে। এখন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে না। মরা কাটালের কারণে বনে যেতে পারিনি। সামনে গোনের জোয়ারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
দক্ষিণ বেদকাশির জেলে আব্দুল মজিদ ঢালি বলেন, ‘তিন মাস কোনো আয় ছিল না। দোকানদারের কাছে ধার হয়েছে। এবার মাছ-কাঁকড়া ধরে সেই ধার শোধ করতে চাই। অনুমতি নিয়েছি, কিন্তু বনে যাওয়ার খরচ জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন জানান, তাঁদের স্টেশনে ৮৮৪টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ৩৪২ জন জেলে বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়েছেন।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং নদীতে মরা কাটাল চলছে। এ কারণে অনেকে অনুমতি নেননি। আবার যারা অনুমতি নিয়েছেন, তাঁদের অনেকে সামনে গোনের জোয়ারে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে নিবন্ধিত বিএলসি রয়েছে ২ হাজার ৭১৭টি। অন্যদিকে সাতক্ষীরা রেঞ্জে রয়েছে ২ হাজার ৯০০টি। প্রতি নৌযানে সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। ধাপে ধাপে এসব জেলে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে প্রবেশ করেন।
জেলেদের একটি অংশের অভিযোগ, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মের খরচের পাশাপাশি দস্যুদের চাঁদার বিষয়টি তাঁদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন আয় না থাকায় অতিরিক্ত এই অর্থের জোগান দেওয়া অনেকের পক্ষেই কঠিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেন, সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারি রাজস্বের বাইরে বাড়তি অর্থ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ও অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতায় কেউ কেউ গোপনে বনে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরেছেন বলে তাঁদের অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জেলেদের অভিযোগ, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় সারা বছর মাছ ধরা নিষিদ্ধ হলেও কোথাও কোথাও অবৈধভাবে মাছ ধরার ঘটনা ঘটে। বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার কারণে বনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়ার পরিমাণ কমে যাচ্ছে বলেও তাঁদের আশঙ্কা।
একদিকে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য জেলেদের মধ্যে যখন অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ফিরতে শুরু করেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
তিন মাস বন্ধ থাকার পর সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। ট্যুর অপারেটরদের নৌযানগুলোও আবার ব্যস্ত হয়ে উঠছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএএস) সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির অধীনে ৭৫টি নৌযান রয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার জানান, সুন্দরবন খোলার পর খুলনা থেকে ১০টি লঞ্চে প্রায় ৩১০ জন পর্যটক বনে গেছেন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনে নিয়মিত নজরদারি চালানো হয়েছে। এতে বনের প্রাণ-প্রকৃতি ও মাছের প্রজনন স্বাভাবিকভাবে চলার সুযোগ পেয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। বনজীবী ও পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বনদস্যুদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সমন্বয়ে সুন্দরবনে নিয়মিত নজরদারি চলছে।
তবে সুন্দরবনের দুয়ার খোলার পর জেলেদের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরে দীর্ঘ তিন মাসের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া। বাস্তবে বৈরী আবহাওয়া, নদীর প্রতিকূলতা, অর্থসংকট ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সেই প্রত্যাশাকে এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। সুন্দরবন খুললেও তাই উপকূলের বহু জেলের কাছে জীবিকার পথটি এখনো পুরোপুরি খোলেনি।
সুন্দরবনে সম্প্রতি নতুন করে বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে, বাউয়ালি ও মৌয়ালসহ সামগ্রিক বনজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তা সংকট ও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর
মাসে বনের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর থেকে একাধিক সশস্ত্র দস্যুবাহিনীর আনাগোনা এবং জেলেদের অপহরণের ঘটনা নতুন করে উপকূলীয় অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চার বাহিনীর ৫২ জন আত্মসমর্পন করলেও থেমে নেই দস্যুবৃত্তি। সর্বশেষ ২১ জন জেলেকে অপহরণ করেছে দস্যুরা। বনমন্ত্রীর আহ্বানে কোনভাবে সাড়া দিচ্ছে না দস্যু দলগুলো।
খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের সুন্দরবন উপকূলবর্তী প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। এলাকায় তেমন কর্মক্ষেত্রও না থাকায় অধিকাংশ মানুষ জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। মাছ-কাঁকড়া, মধু আহরণ, গোলপাতা আহরণসহ নানা ধ২০২৩-২০২৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় দস্যু দলের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে।
বিশেষ করে সম্প্রতি (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আমবাড়িয়া, কটকা ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকা থেকে মজনু ও শরীফ বাহিনীসহ বিভিন্ন অজ্ঞাত দস্যুদল দুই দিনে অন্তত ২১ জন জেলেকে অপহরণ করেছে। দস্যুরা জেলেদের জিম্মি করে নৌকা, মোবাইল ফোন ও রসদ লুটে নিচ্ছে এবং মুক্তিপণের দাবি জানাচ্ছে। মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুমে মৌয়াল ও বাউয়ালিদের কাছ থেকে ট্রলার প্রতি বড় অঙ্কের চাঁদা বা ‘টোকেন মানি’ দাবি করা হচ্ছে।
চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মারধর, বনের গভীরে আটকে রাখা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই জীবিকার তাগিদে বনে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছেন। ক্রমাগত চাঁদাবাজি এবং অপহরণের ভয়ে অনেক দরিদ্র বনজীবী তাদের পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় জানান, সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সুন্দরবনের ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় জেলেদের বহরে হামলা চালায় বনদস্যু মজনু বাহিনী সদস্যরা।
এ সময়ে তারা একটি ফিশিং ট্রলারসহ ১৫টি নৌকা থেকে একজন করে সর্বমোট ১৫ জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে আপহরণ করে। অপহৃত জেলেদের মধ্যে ১০ জেলের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০), ফেরদাউস (২৮), ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজ (৩৫), আলাআমিন (২৮), হানিফ (৩৮), মারুফ (৪৯)। এসব জেলেদের বাড়ি খুলনা, বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকায়। এ সকল জেলেরা বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে চিরপাটা, পোকাজাল ও বড়শি দিয়ে সুন্দরবনের খালে মাছ ধরছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি কমে যাওয়ার কারণেই সেখানে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। আসাবুর বাহিনী, শরীফ বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী এবং আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী, সাগর বাহিনী-আলম ওরফে পাটওয়ারী বাহিনী পশ্চিম সুন্দরবন, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কিছু বন্দিও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি দস্যু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এমনকি অতীতে আত্মসমর্পণ করা অনেক দস্যুও আবার পুরোনো পেশায় ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলেরা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর বনে প্রবেশ করার পর থেকেই এই চাঁদাবাজির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বনে নির্বিঘে কাজ করার জন্য নৌকা প্রতি মোটা অঙ্কের অগ্রিম ‘সুরক্ষা অর্থ’ বা টোকেন মানি দিতে হচ্ছে।
উপকূলীয় বনজীবী ফোরামের আহবায়ক বাচ্চু মীর ইনকিলাবকে বলেন, এই দস্যু আতঙ্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পে। এছাড়া দস্যুরা অবৈধ হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মতো অপরাধে জড়িত থাকায় বনের পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ যৌথ অভিযান জোরদার করেছে। কোস্টগার্ডের ‘অপারেশন রিস্টোর পিস’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মাধ্যমে বেশ কয়েকজন দস্যুকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে এবং বেশ কিছু অপহৃত জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আবারও বনদস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। মাছ ধরতে যাওয়া জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ নেয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
সূত্রমতে,
রনের পেশার সঙ্গে জড়িত এ উপজেলার মানুষ। গত কয়েক বছর সুন্দরবনে বনদস্যুদের উৎপাত কমছিল। কিন্তু সম্প্রতি সুন্দরবনে