নেত্রকোনা প্রতিনিধি :
জীবনের অধিকাংশ সময়ই অভাব-অনটন, স্বামী ও সন্তান হারানো শোক বুকে নিয়েই কাটিয়েছেন মনোয়ারা বেগম। একমাত্র ছেলের মৃত্যু, অসুস্থ স্বামীকে সুস্থ করার লড়াই, দারিদ্র্যতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে যেন জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে লড়াইয়ের মধ্যেই থাকতে হয়েছে। তবুও দেখা দেয় নি সুখ নামের মরীচিকা।
সেই মনোয়ারা বেগম নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী।
চলতি বছর মনোয়ারা বেগমের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও যখন কালবৈশাখী ঝড়ে ভেঙে পড়ে, তখন মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আজ মঙ্গলবার সকালে তার উপহারে নির্মিত নতুন টিনের ঘরে উঠেছেন আশ্রয়হীন এই নারী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনোয়ারা বেগমের স্বামী আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তাঁর চিকিৎসা করতে নিজেদের সামান্য জমিজমাও বিক্রি করে দেন তিনি। কিন্তু সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি।
এর কিছুদিন পর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার একমাত্র ছেলে আলিফ মিয়া। স্বামী-সন্তান হারিয়ে তখন পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েন মনোয়ারা।
অভাবের তাড়নায় অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন মনোয়ারা বেগম। দারিদ্রতার মধ্যেই প্রতিবেশীদের সহায়তায় তিন মেয়েকে বিয়ে দেন। তবে মেয়েদের সংসারও স্বচ্ছল নয়।
ফলে স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট একটি টিনের ঘরই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। সম্প্রতি কালবৈশাখী ঝড়ে সেই ঘরটিও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করেন তিনি।
এরমধ্যে স্থানীয় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর মনোয়ারা বেগমের ঘরটি ঝড়ে ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তলে ধরেন। এটি দেখে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ব্যক্তিগত তহবিলের টাকা দিয়ে ঘর নির্মাণ করে দেন।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুর রশিদ বলেন, “মনোয়ারা বেগমের ঘরটি ঝড়ে ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য দেখে খুব খারাপ লেগেছিল। এ নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহযোগিতার আবেদন জানাই।
ভিডিওটি নজরে আসে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের। পরে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বৃদ্ধাকে ঘর করে দেন। দীর্ঘদিন পর তিনি নিরাপদ একটি আশ্রয় পেলেন।
মনোয়ারা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, জামাইরে (স্বামী) বাঁচাইতে ফসলী জমি বেইচ্চে (বিক্রি) দিছি। জামাই মরার শোক শেষ অইলনা এরমধ্যে ছেড়াডাও (ছেলে) মইরা গেছে। মাইনষের বাড়িত কাম কইরে দিন চলত।
তুফান (ঝড়) যহন আমার থাহার ঘরডাও ভাইঙা ফালছে, তহন মনে হইছিন খোদাও আমার থাইক্কা মুখ হিরায়া নিছে। খোলা আসমানের নিচে কষ্টে আছিলাম। আজ নতুন ঘরে উঠ্ঠে মনে অইছে আর কয়ডা দিন নয়া কইরা বাঁচাম।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার সাব আমার মতো দুঃখী মানুষের কথা ভাইব্বে ঘর কইরা দিছে। আমি তার লাইগা দোয়া করি, আল্লাহ যাতে তারে ভালা (সুস্থ) রাহে।
এ বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ আছেন, যারা নীরবে কষ্ট সহ্য করে জীবনযাপন করেন। মনোয়ারা বেগমের বিষয়টি জানতে পেরে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি।
একজন মানুষ জীবনে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করে টিকে আছেন।এটা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমি বিশ্বাস করি, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে অনেক অসহায় মানুষ নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।
মনোয়ারা বেগমের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করতে পেরে আমি মানবিক তৃপ্তি অনুভব করছি। ভবিষ্যতেও এলাকার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।