সেলিম রেজা, শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
দূর থেকে দেখলে মনে হয় সোনালি ফসলের সমারোহ, কৃষকের ঘরে বুঝি ফিরছে স্বস্তি। কিন্তু ধান কেটে ঘরে তোলার পর হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে ভিন্ন চিত্র। উৎপাদন ভালো হলেও লাভের অংক মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকের কাছে ধান নয়, খড়ই হয়ে উঠছে শেষ ভরসা। খড়েই টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন তারা।
এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন কৃষক আজগর আলী । তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। জমি নিজের না হলে বর্গা নিলে খরচ যোগ হয়ে তা ২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। জমি প্রস্তুত, বীজতলা, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন-প্রতিটি ধাপেই আগের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে।
আজগর আলী বলেন, ‘আগে যে কাজ ৬০০-৭০০ টাকায় হতো, এখন ১০০০-১১০০ টাকা লাগে। ধান কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয় বা মেশিন আনতে হয়। এখন ধান ভালো হইলেও লাভ থাকে না। খরচ বেশি। ধানের দাম বাড়ে না। শেষ পর্যন্ত খড়টাই শুধু লাভ থাকে।’
কৃষক আজগর আলী আরও বলেন, ‘যাদের টাকা আছে, তারা ধান ধরে রাখতে পারে, পরে ভালো দামে বিক্রি করে। কিন্তু গরিব কৃষকের সেই সুযোগ নাই। আমাদের তো ধান কাটার পরই বিক্রি করতে হয়।’ধান সংরক্ষণের সুযোগ না থাকাও ছোট কৃষকদের বড় সমস্যা। অধিকাংশ কৃষক ধান কাটার পরপরই তা বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ তাদের ঋণ শোধ করতে হয়, শ্রমিকের টাকা দিতে হয়, সংসার চালাতে হয় এবং পরবর্তী চাষের প্রস্তুতিও নিতে হয়। ফলে বাজারে যখন সরবরাহ বেশি থাকে এবং দাম কমে যায়, ঠিক সেই সময়েই তারা ধান বিক্রি করেন।
কৃষক জুয়েল হাসানের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ২১ মণ ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে সংসারের প্রয়োজন ও দেনা পরিশোধের চাপে ১২ মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এতে কিছু খরচের টাকা উঠলেও লাভ বলতে কিছু থাকেনি তার হাতে।
জুয়েল হাসান বলেন, ‘বাড়িতে দুইটা গরু আছে। তাই জমির খড়গুলোই আমার লাভ। আমরা ধান চাষ বন্ধ করতে পারি না। ঘরের খাবারের জন্য ধান লাগবেই। কিন্তু বাজারে বিক্রি করে লাভ হয় না। ছোট কৃষক আর বর্গাচাষিরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে।’
কৃষকদের ভাষ্যমতে, ধানের পাশাপাশি খড় এখন আলাদা অর্থনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। যাদের গরু-ছাগল আছে, তারা খড় ব্যবহার করতে পারেন। আবার কেউ কেউ খড় বিক্রি করেও কিছু টাকা পান। কিন্তু সেটি মূল ফসলের লোকসান পুষিয়ে দেওয়ার মতো নয়। তারপরও কৃষকরা বলছেন, ধান বিক্রিতে লাভ না থাকলে অন্তত খড় বিক্রি করে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন।
কষ্টের কথা জানিয়ে উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের কৃষক শামসুল হক বলেন, ‘ধানের মাঠ দেখে সবাই ভাবে কৃষক লাভে আছে। কিন্তু খরচের হিসাব কেউ দেখে না। জমিতে ফসল আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে টাকা নাই। চলতি মৌসুমে কৃষকের ঘরে উঠছে নতুন ধান। কিন্তু সেই ধানের সঙ্গে ঘরে ঢুকছে ঋণের চাপ, বাজারদরের হতাশা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। ধান কাটার আনন্দ তাই অনেক কৃষকের কাছে পরিণত হয়েছে হিসাব মেলানোর দুশ্চিন্তায়।
শেরপুর উপজেলার বিভিন্ন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফলন মোটামুটি ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। বিশেষ করে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। অনেক বর্গাচাষি জমির মালিককে ভাগ বা ভাড়া দেওয়ার পর নিজের জন্য সামান্য ধানও রাখতে পারছেন না। লোকসানের হিসাব জেনেও চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ধান চাষ বন্ধ করাও কৃষকের পক্ষে সহজ নয়। কারণ ধান শুধু বিক্রির পণ্য নয়, অনেক পরিবারের সারা বছরের খাবারের নিশ্চয়তা। কৃষকরা বলছেন, বাজারে ধান বিক্রি করে লাভ না থাকলেও ঘরের ভাতের জন্য ধান লাগবেই। তাই লোকসানের হিসাব জেনেও তারা ধান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন।
শেরপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ১৯৬০ মেট্রিকটন ধান ও ১৯৪৯ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান ও ৪৮ টাকা কেজি দরে চালের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কৃষক সর্বোচ্চ ৩ টন ধান সরবরাহ করতে পারবেন।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ভালো ফলন হলেই কৃষকের মুখে হাসি ফোটে না। ন্যায্য দাম, কম উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণের সুবিধা এবং সহজ সরকারি সহায়তা-সব মিললেই কৃষক প্রকৃত অর্থে লাভবান হন।
এক বিঘা জমির এই গল্প শুধু কৃষক আজগর আলী ও জুয়েল হাসানের নয়। এটি শেরপুর উপজেলার হাজারো কৃষকের কৃষি জীবনের বাস্তবতা। সোনালি ধানের প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ঘাম, ঋণ, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার দীর্ঘ লড়াই। ধান ঘরে ওঠে ঠিকই, কিন্তু লাভের খাতা শূন্য থাকে; শেষে কৃষকের মুখে একই কথা-ধান নয়, খড়টাই এখন ভরসা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা ধান চাষে খরচ মোট খরচ হয় সর্বোচ্চ ২৩ হাজার টাকা।
উৎপাদন ও বিক্রিঃ
শেরপুরে ১ বিঘায় সাধারণত ২০ থেকে ২২ মণ ধান হয়। গড় হিসেবে ধরা হলো ২০ মণ। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে অনেক জায়গায় ধানের দাম ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা মণ। অন্যদিকে সরকার চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা কেজি, অর্থাৎ প্রায় ১,৪৪০ টাকা মণ নির্ধারণ করেছে।
লাভ-লোকসানের হিসাবঃ
স্থানীয় বাজারে ১০০০ টাকা মণে বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা হয়। ফলে ৩ হাজার টাকা লোকসান হবে। স্থানীয় বাজারে ১১০০ টাকা দরে বিক্রি করলে ২২ হাজার টাকা হবে। তবুও ১ হাজার টাকা লোকসান। সরকারি দরে ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে বিক্রি করলে ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে ৫ হাজার ৮০০ টাকা লাভ হবে।