নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (নেবি) জনবল নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি নিয়োগে একাধিক চাকুরী প্রত্যাশী এসব অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা দাবি করেন-লিখিত, ব্যবহারিক, শারীরিক ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের চাকুরী দেওয়া হয়নি। ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। এসব অভিযোগ ওঠেছে নেবি: ভিসি ও ট্রেজারারের বিরুদ্ধে। তবে ভিসির দাবী একটা পক্ষ অপপ্রচার করছে।
চাকরি প্রার্থীদের দাবী, নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে ফলাফল প্রকাশে চরম অস্বচ্ছতা দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ না করে গোপনীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি সরকারি নিয়োগ বিধিমালার পরিপন্থী বলে দাবি তাদের। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও চাকরিতে আবেদনকারীরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের ২৪ জন শিক্ষক, ৩ জন কর্মকর্তা ও ১২ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে আবেদন জমার জন্য মাত্র ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সাধারণত এক মাস সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়াও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের শেষ সময় ১ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু পরদিন ২ফেব্রুয়ারি থেকেই ঢাকায় বিভিন্ন বিভাগের নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। চাকরিবিধি ২০১৮ মোতাবেক বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির মাধ্যমে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করে নিয়োগ পরীক্ষা বোর্ড আয়োজনের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ম নীতি কাগজে কলমেই থেকে গেছে নেবি: নিয়োগের ক্ষেত্রে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নিয়োগপ্রাপ্তরা নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারী বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগেও পছন্দের লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বোর্ড আয়োজনের আগে ন্যূনতম পাঁচ কর্মদিবস সময় দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পরিচিত প্রার্থীদের দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকায় নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন করা হয়। এমনকি ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে সিন্ডিকেট সভা করে পরদিনই ১৯ জন শিক্ষককে যোগদান করানো হয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও মেডিকেল অফিসারকে নেত্রকোনা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ তাদের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ যখন ভোটাধিকার ফিরে পেয়ে উৎসবমুখর নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই রাতের আঁধারে ঘুষ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এপ্রিল অনুষ্ঠিত কয়েকটি পদে লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলও প্রকাশ করা হয়নি।
জানা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বঞ্চিত করা হচ্ছে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের। বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সাংবাদিক সমিতিসহ লেখালেখি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বক্রিয় হতে দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জাতীয় দিবস ও বিশ্ববিদ্যালয় দিবসসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য বাজেট থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন করা হয় না বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থী আসিফুর রহমান বলেন, চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে প্রশ্নবিদ্ধ ও সন্দেহজনক বিষয়। টাকা ছাড়া নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউকে চাকরি দেওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে। ভিসি ও ট্রেজারের ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। তাহলে তাদের দুর্নীতির ফিরিস্তি বের হবে।
প্রার্থী মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন-এর মাধ্যমে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের পরিবর্তে বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিম। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।