সেলিম রেজা, শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শেরপুরের বথুয়াবাড়ী নৌকা বাইজ মেলার ব্যস্ত বিনোদন কেন্দ্র। চারদিকে আলোঝলমলে পরিবেশ, তরুণ-তরুণী আর শিশুদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ রাইডে চড়ে আনন্দে চিৎকার করছেন, কেউ আবার দামি রেস্তোরাঁয় বসে পছন্দের খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন। চারপাশের বাতাসে শুধুই আনন্দের গুঞ্জন আর উল্লাসের প্রতিধ্বনি।
ঠিক এই উল্লাসমুখর পরিবেশেরই এক কোণে, কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন ৪০ বছর বয়সী আশরাফুল ইসলাম। কাঁধে তার রঙিন বেলুনের ঝাঁকা। কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে তিনি তাকিয়ে আছেন চাকা ঘুরিয়ে আনন্দ পাওয়া ওই শিশুদের দিকে।
শিশুদের আনন্দ যেখানে ‘উল্লাস’, আশরাফুলের কাছে সেটাই ‘জীবিকা’। একটি বেলুন বিক্রি হলে তবেই রাতে তার ঘরে জ্বলবে চুলো। এটিই আমাদের চেনা সমাজের চেনা বাস্তবতা যেখানে একজনের বিনোদন বা উল্লাসের ক্ষেত্রটি অন্য আরেকজনের বেঁচে থাকার নির্মম লড়াই।
উৎসবের নেপথ্যে একদল মানুষের ক্লান্তিহীন শ্রম
শুধু বিনোদন কেন্দ্রই নয়, যেকোনো উৎসব-পার্বণে এই বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ঈদে, পূজায় কিংবা নববর্ষের উৎসবে যখন সাধারণ মানুষ নতুন পোশাকে ঘুরে বেড়ায়, তখন রিকশাচালক, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা, কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক:
উৎসবের দিনে মানুষের যাতায়াতের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে তারা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। সবার যখন ছুটির আনন্দ, তাদের তখন বাড়তি আয়ের সুযোগ।
ফেরিওয়ালা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী:
মেলার মাঠে বা রাস্তার মোড়ে খেলনা, বাঁশি কিংবা আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর উৎসব পালনের সময় মেলে না। ক্রেতাদের আনন্দ দেওয়াই তাদের রুটি-রুজির উৎস।
”মানুষ যখন পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হয়, তখন আমাদের আয় একটু ভালো হয়। তাদের আনন্দ দেখে ভালো লাগে, কিন্তু দিনশেষে আমাদের কাছে এটা শুধুই পেট চালানোর যুদ্ধ।” এমন কথা বলেন মো. করিম, মেলা প্রাঙ্গণের এক ফুচকা বিক্রেতা।
ব্যবধান কমাক সহমর্মিতা:
অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই চিরন্তন রূপটি সহজে বদলানো সম্ভব না হলেও, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে এই ব্যবধান কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, যারা আমাদের আনন্দ বা উল্লাসের মুহূর্তগুলোকে সহজ ও রঙিন করে তুলছেন, তাদের প্রতি আমাদের আরও সংবেদনশীল হওয়া উচিত। সামান্য বাড়তি বকশিস, একটু মৃদু হাসি কিংবা একটুখানি সম্মানজনক আচরণই পারে তাদের এই কঠিন জীবিকাকে কিছুটা হলেও ম্লান থেকে উজ্জ্বল করতে।
দিনশেষে, উৎসবের আলো সবার জীবনে সমানভাবে না পৌঁছালেও, “কারও উল্লাস” যেন “কারও জীবিকার” প্রতি অবহেলা বা নিষ্ঠুরতার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলের।