কাওসার আহমেদ.
নাটোরের গুরুদাসপুরে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পেয়েই ‘বিচার করার’ হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তির পর স্থানীয় লোকজন নিয়ে সভা করে তিনি এ বক্তব্য দেন।
এদিকে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ফিরোজকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন তাঁর সমর্থকেরা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুরে স্থানীয় লোকজন নিয়ে একটি সভায় বক্তব্য দেন ফিরোজ। সেখানে তিনি বলেন, “এই যে আমাকে সাজা দিল। দুর্নীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আপনাদের ধারণা আছে?
আমার বিরুদ্ধে মামলা দিল। চারজনের সাক্ষীতে যদি আমাকে যাবজ্জীবন জেল দেয়, তাহলে এখানে কয়েক হাজার লোক আছে, এরা তো সবাই সাক্ষী দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা কী করেছে। বিচার হবে। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, এই নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে।”তবে কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন, তা বক্তব্যে স্পষ্ট করেননি।
ফিরোজ নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
বাদীর পরিবারের অভিযোগ
মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ফিরোজ ও তাঁর লোকজন তাঁদের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। মামলা আপস করার জন্য টাকার প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ। তবে মেয়ের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তাঁরা মামলা চালিয়ে যান।
তিনি বলেন, আদালতের রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট ছিলেন। প্রায় ১১ মাস কারাগারে থাকার পর আপিলে জামিন পেয়ে ফিরোজ এলাকায় ফিরে এসে আবারও ‘বিচার করার’ হুমকি দিয়েছেন। এতে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
যেভাবে ঘটেছিল ঘটনা
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুরুদাসপুর উপজেলার একটি গ্রামের ওই ছাত্রী নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে এলে বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে প্রধান শিক্ষক ফিরোজ তাঁকে জোরপূর্বক একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
পরে তাঁকে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা আইনগত ব্যবস্থা নেন। পরে ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ফিরোজ ও তাঁর দুই ভাইকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন।
মামলার পর ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর রাত সোয়া ১২টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলা এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র্যাব-৫।
আদালতের রায়
মামলার নথি ও সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য অনুযায়ী, রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার শেষে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ফিরোজকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপহরণের পৃথক ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
মামলায় অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
সরকারি কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং মামলার আলামত হিসেবে উপস্থাপিত ভিডিওসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত ফিরোজকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
তিনি বলেন, রায়ের আগে ২৭ নভেম্বর ধার্য তারিখে হাজিরা দিতে গেলে ফিরোজের জামিন বাতিল করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে রায় ঘোষণার সময় তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
কারাগারের সামনে ফুলের মালা
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাজশাহী কারাগারের মূল ফটক থেকে দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে ফিরোজকে নাজিরপুরে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাঁর সমর্থকেরা ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করেন। পরে নাজিরপুরে আয়োজিত সভায় বক্তব্য দেন তিনি।
ফিরোজের মুক্তি ও ফুলের মালা দিয়ে বরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে বাদীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, “ধর্ষণ মামলার বাদীকে অন্যায়ভাবে হুমকি দেওয়া হলে অভিযোগ সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”