পটুয়াখালীর দশমিনা, বাউফল ও গলাচিপা উপজেলার প্রধান নদ-নদীগুলোতে অস্বাভাবিক হারে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে তীব্র নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। তেঁতুলিয়া, লোহালিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ, আগুনমুখা ও রাবনাবাদ নদীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে লঞ্চ, কার্গো, পণ্যবাহী ট্রলার এবং পায়রা বন্দরগামী লাইটার জাহাজের চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম ইলিশসমৃদ্ধ এ নদীগুলোতে মাছের উৎপাদন ও আহরণ কমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো জেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তেঁতুলিয়া নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট এবং গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহন নৌ-রুট। প্রতিদিন এ নৌপথে শত শত যাত্রী ও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং না হওয়ায় নদীতে পলি জমে বিভিন্ন স্থানে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, গলাচিপা উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র উলানিয়া বন্দরে বর্তমানে ছোট নৌযান চলাচল করলেও বড় নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বন্দরনির্ভর ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে গলাচিপা ও বদনাতলী লঞ্চঘাট থেকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি লঞ্চ যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের যাত্রীদের দশমিনার আউলিয়াপুর ঘাটে গিয়ে ঢাকাগামী লঞ্চে উঠতে হচ্ছে। এছাড়া বদনাতলী-চরকাজল নৌরুটে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে শুকনো মৌসুমে কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হয়।
নৌযান চালকদের অভিযোগ, নদীর অনেক অংশে নাব্যতা এতটাই কমে গেছে যে বড় লঞ্চ ও কার্গো জাহাজকে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জোয়ারের সময় ছাড়া নৌযান চলাচলই সম্ভব হয় না। এতে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
উপকূলীয় এসব নদী ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণ ও আহরণ এলাকা হওয়ায় নাব্যতা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্য খাতে। স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীতে চর জেগে ওঠায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় মাছের উৎপাদন ও আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক জেলে ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে নাজিরপুর এলাকা থেকে লালমোহনগামী ট্রলারগুলোকে বর্ষা মৌসুমেও নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সময় ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. হানিফ বলেন, “একসময় ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের এই নৌরুটে অসংখ্য স্টেশন ছিল। এখন নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীসংখ্যাও কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একাধিকবার পরিদর্শন করে আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে কালাইয়া বন্দরসহ বিভিন্ন নদীবন্দর সচল রাখতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, নৌযান মালিক ও ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে তেঁতুলিয়াসহ উপকূলীয় নদীগুলোর ড্রেজিং কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দক্ষিণাঞ্চলের নৌ যোগাযোগ, বাণিজ্য, পায়রা বন্দরের নৌপরিবহন এবং ইলিশসহ সামগ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব আরও গভীর হবে।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, “তেঁতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কালাইয়া বন্দর ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”