পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, চিকিৎসক ও কক্ষের স্বল্পতা এবং ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ নিয়ে কার্যত জোড়াতালির ওপর নির্ভর করে চলছে।
দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গম এ হাসপাতালটি শুধু গলাচিপা নয়, পার্শ্ববর্তী রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র হলেও বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর ধরে হাসপাতালে কোনো আলট্রাসনোগ্রাম (আল্ট্রাসাউন্ড) মেশিন নেই। ফলে গর্ভবতী নারীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনের অভাবে এখনও বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন দিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো প্রযুক্তির এ মেশিনে মানসম্মত ও পরিষ্কার ছবি না পাওয়ায় অধিকাংশ রোগীকেই বাইরে গিয়ে ডিজিটাল এক্স-রে করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা পেতেও বিলম্ব হচ্ছে।
শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম নয়, হাসপাতালের ভবনের অবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কক্ষের ছাদ এবং দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। এতে রোগী, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
রুম সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় অনেক সময় একই কক্ষে দুইজন চিকিৎসককে রোগী দেখতে হয়। এতে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, স্বাচ্ছন্দ্যে চিকিৎসা প্রদান এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
৫০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ইনডোরে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া প্রতিদিন আউটডোরে চিকিৎসাসেবা নেন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী। অর্থাৎ হাসপাতালটি তার ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগীর চাপ সামাল দিচ্ছে।
অতিরিক্ত রোগীর কারণে সরকারের বরাদ্দকৃত ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিএজেন্ট বছরের শেষ পর্যন্ত টেকে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বরাদ্দের অধিকাংশ ওষুধ ও রিএজেন্ট পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে বাধ্য হতে হয়।
গলাচিপা উপজেলার বাসিন্দা নিকর হাওলাদার বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য এই হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। অথচ এখানে আলট্রাসনোগ্রাম নেই, আধুনিক এক্স-রে নেই, ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, চিকিৎসক ও জনবল বৃদ্ধি এবং ওষুধ-রিএজেন্টের বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “গলাচিপা উপজেলার চার লক্ষাধিক মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলা থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।
কিন্তু এটি মাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল হওয়ায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় শয্যা না থাকায় রোগীদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যান।”
তিনি আরও বলেন, “রোগীর সংখ্যার তুলনায় ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে আরও উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রতিদিন নতুন করে ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি হন এবং সার্বক্ষণিক হাসপাতালে দেড়শ থেকে দুইশ রোগী ভর্তি থাকেন।”
চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমরা এখনও বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন দিয়ে সেবা দিচ্ছি, যা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। এছাড়া গাইনি বিভাগের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রায় আট বছর ধরে নষ্ট। নতুন মেশিনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে।”
হাসপাতালের ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, “ভবনটি অত্যন্ত পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে ফাটল দেখা দেয়, মেরামত করা হলেও কিছুদিন পর আবার একই সমস্যা দেখা দেয়। জোড়াতালি দিয়ে এভাবে একটি হাসপাতাল দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব নয়।”
তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। গলাচিপার বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত একটি নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র সরকারি ভরসা গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আধুনিক, নিরাপদ ও যুগোপযোগী করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।