সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
জীবনের শেষ মুহূর্তটিও যেন কাটল সেই ঘরেই, যে ঘরের সেবায় তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। বছরের পর বছর মানুষের কানে আজানের ধ্বনি পৌঁছে দিয়ে নামাজের আহ্বান জানানো মানুষটি নিজেও শেষবারের মতো অজু করে গিয়েছিলেন আল্লাহর ঘরে নামাজ আদায় করতে। কিন্তু আর ফিরে আসা হয়নি। মসজিদেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার জিতাশ্বরী দক্ষিণ পাড়া এলাকার বাসিন্দা হুসেন আলী (৭২)।
গতকাল (২২ জুলাই) সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মতো নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি জিতাশ্বরী বাজার জামে মসজিদে যান। অজু শেষ করে মসজিদে প্রবেশের মাত্র এক-দুই মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। উপস্থিত মুসল্লিরা তাড়াতাড়ি তাকে সাহায্যের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আল্লাহর ঘরেই শেষ হয়ে যায় তার দুনিয়ার যাত্র।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল ১০টায় জিতাশ্বরী দক্ষিণ পাড়া আল-মদিনা জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। সবার চোখেমুখে ছিল শোক আর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনা।
স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ইউসুফ কবির বলেন, বয়সের ভার থাকলেও দ্বীনের প্রতি হুসেন আলীর ভালোবাসা ছিল ঈর্ষণীয়। প্রায় চার বছর ধরে তিনি নিয়মিত কোরআন শিক্ষা করছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছয় পারা কোরআন দেখে সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করতে পারতেন। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তার মধ্যে কখনো কমেনি।
তিনি আরো বলেন, শুধু কোরআন শিক্ষাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি তাবলিগ জামাতের দ্বীনি মেহনতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৪০ দিনের চিল্লাসহ বিভিন্ন দ্বীনি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি এলাকার একটি মসজিদে দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে মুয়াজ্জিন হিসেবে আজান দিয়েছেন। মসজিদের খেদমতকে তিনি কখনো উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং ইবাদত হিসেবেই দেখতেন।
জিতাশ্বরীর কামরুল হাসান বলেন, হুসেন আলী ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, মসজিদের কাজে এগিয়ে আসা এবং তরুণদের নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
তিনি বলেন, যে মানুষটি সারা জীবন আজানের সুরে মানুষকে আল্লাহর ঘরে ডেকেছেন, কোরআন শেখার চেষ্টা করে গেছেন এবং নিঃস্বার্থভাবে মসজিদের খেদমত করেছেন, তার শেষ বিদায়ও হলো সেই মসজিদ থেকেই।
স্থানীয়রা বলেন, তিনি অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। তার এই বিদায় সবার কাছেই একটি নীরব বার্তা।আমরা তার আজানের ধ্বনি আর শুনতে পারব না এটা ভাবতেই পারছি না। ইবাদতের সঙ্গে কাটানো জীবনই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর সেই পরিচয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে হুসেন আলী।