বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। তিনি বলেছেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধের পথে।
একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন কর্মীরা। অথচ নির্বাচনের আগে জনগণকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অলি আহমেদ বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়েছে। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না, বরং বিদ্যমান অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে। ফলে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, উল্টো পুরোনো কর্মীদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছে না, রাস্তাঘাটেও নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশে আদৌ কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিচার পেলেও সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিজের ছেলের ভোট পুনর্গণনা-সংক্রান্ত একটি মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যুক্তি যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হলেও এ ধরনের বিষয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অলি আহমেদ। তিনি বলেন, দেশের অনেক ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যেসব ব্যাংকমালিকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাঁদের ব্যাংক পরিচালনার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন। অনেকে এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় অনুমতি পাচ্ছেন না।
এ সংকট সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। অলি আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতে হবে, যাতে তাঁরা বিদেশে গিয়ে প্রবাসীদের সমস্যার কথা শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে অর্থনীতি ও সমাজে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন কর্নেল অলি। তিনি বলেন, প্রতিদিন পণ্যের দাম বাড়ছে, অথচ মানুষের আয় বাড়ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় গেলে তাঁদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের থাকতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ইউএনও ও ওসির দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের অনুসরণ করা নয়, বরং নিজ নিজ দাপ্তরিক কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা।
এ সময় ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করেন এলডিপি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের আন্দোলনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ওই আলোচনায় নির্বাচনের ৪০ দিন আগে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া এবং উভয় পক্ষের সমঝোতায় একটি মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় সেই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়নি।
কর্নেল অলি মনে করেন, সে সময় সমঝোতা কার্যকর হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে অলি আহমেদ বলেন, তাঁর আশপাশে থাকা অনেকেই সঠিক পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা রাখেন না। ভুল পরামর্শের কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তিনি মন্তব্য করেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রকৃত প্রতিপক্ষ বিরোধী দল নয়, বরং তাঁর আশপাশে থাকা ভুল পরামর্শদাতারা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিছু রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে অলি আহমেদ বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা। মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও বক্তব্য ও আচরণে দায়িত্বশীল হতে হবে।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের পেটে ভাত নেই, চোখে ঘুম নেই। অথচ জনগণের এসব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ানো হচ্ছে। সরকারকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে এবং সব পক্ষ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
সরকারকে সময় থাকতে অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ।