বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ।
রোববার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
অলি আহমেদ বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার আগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক কারখানা। নতুন বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, বরং পুরোনো কর্মীদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে মানুষ রাতে নিরাপদে ঘুমাতে এবং রাস্তায় নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারছে না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যকরভাবে বজায় আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি অভিযোগ করেন, সবাই সমানভাবে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিচার পেলেও অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিজের ছেলের পুনর্গণনা-সংক্রান্ত একটি মামলার উদাহরণ টেনে অলি আহমেদ বলেন, এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেতে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ প্রয়োজনীয় যুক্তি ও নথিপত্র যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব।
ব্যাংকিং খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের অনেক ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে যেসব ব্যাংকমালিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাদের ব্যাংক পরিচালনার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে।
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট-সংক্রান্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করে অলি আহমেদ বলেন, অনেক প্রবাসী দুই থেকে তিন বছর আগে ভিসা নিয়ে বিদেশে গেছেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী নতুন ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করেও অনেকে অনুমতি পাচ্ছেন না। এ জন্য এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেও তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রবাসীদের সমস্যা শুনে সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রদূতদেরও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে।
অলি আহমেদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশি কর্মীরা দেশে ফিরে এলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট আরও বাড়বে। তাই প্রবাসীদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
দ্রব্যমূল্য ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন পণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। গ্রামীণ অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়ছে, কারণ সেখানে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে না।
প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, কিছু সংসদ সদস্য এলাকায় গেলে তাদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) থাকতে হচ্ছে। অথচ প্রশাসনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আলাদা হওয়া উচিত। ইউএনও ও ওসির দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করা নয়, বরং নিজ নিজ দাপ্তরিক কাজ যথাযথভাবে পালন করা।
প্রধানমন্ত্রীকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
১৯৯৬ সালের সমঝোতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন অলি আহমেদ
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করে অলি আহমেদ বলেন, সে সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর একটি সমঝোতার প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনের ৪০ দিন আগে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো নির্ধারণের কথা ছিল। বিএনপিও প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে কিছু শর্ত যুক্ত হওয়ায় সমঝোতা আর এগোয়নি।
অলি আহমেদ বলেন, ওই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় আসতে পারত বলে তিনি মনে করেন। অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমানকে সতর্ক করলেন এলডিপি চেয়ারম্যান
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে অলি আহমেদ বলেন, তার চারপাশে থাকা অনেকেই সঠিক পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা রাখেন না। এসব ব্যক্তির ভুল পরামর্শে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু বিরোধী দল নয়, বরং তার আশপাশের ভুল পরামর্শদাতারাও হতে পারেন।
দুর্গাপূজার সময় কয়েকজন নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে অলি আহমেদ বলেন, এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হলো সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ খাদ্যসংকট ও নানা দুর্ভোগে রয়েছে। অথচ এসব সমস্যাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উচিত জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি
আলোচনার শেষ পর্যায়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এলডিপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে হবে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা এবং সম্মিলিতভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।